ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন

 দিলীপ মজুমদার

ঝাড়খণ্ড । ভারতের ২৮তম প্রদেশ।অতীতে মানভূম জেলা সুবে বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল । ১৯১২ সালে ওই জেলাকে বিহার-ওড়িশা রাজ্যে যুক্ত করা হয় । ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে বিহার সরকার স্কুল-কলেজ এবং অফিস-আদালতেহিন্দি ভাষার ব্যবহার আবশ্যিক করলে শুরু হয় আন্দোলন।বাংলা ভাষা-ভাষীদের দেশ মানভূমকে বাংলার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ১৯৫৬ সালে সহস্রাধিক ভাষা সত্যাগ্রহী পুঞ্চার পাকবিড়রা থেকে কলকাতা পর্যন্ত পদযাত্রায় সামিল হন।২০০০ সালের নভেম্বর মাসে গঠিত হয়েছে এই ঝাড়খণ্ড রাজ্য। এই রাজ্য বিহার, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের মিলনস্থল যেন।ঝাড়খণ্ডের জনসংখ্যার ১০% বাংলাভাষী।বাংলা এই রাজ্যের দ্বিতীয় দাফতরিক ভাষা।সেটাও এমনি হয় নি।দীর্ঘ লড়াইএর ফলে হয়েছে।এই লড়াইতে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন,গণমাধ্যম মাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের মদত ছিল ।

কিন্তু বাংলা ভাষা দাফতরিক মর্যাদা পেলেও সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা যথাযোগ্য মর্যাদা পায় নি।ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পরীক্ষকরা হিন্দি বা ইংরেজি ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় লেখা উত্তরপত্র পরীক্ষা করতে অসম্মত হন। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ভাষায় লিখিতউত্তরপত্র পরীক্ষা করতে অস্বীকার করেন পরীক্ষকরা।এর জন্য ঝাড়খণ্ড অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করেন রাঁচি হাইকোর্ট।সেখানকার বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির বেহাল অবস্থা।পরিকাঠামোর জন্য সরকারি অনুদান নেই,বাংলা পাঠ্যবই নেই,বাংলা মাধ্যমে পড়াবার উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না।সরকারি বিদ্যালয়ে বাংলা পাঠ্যবইএর সরবরাহ নিয়মিত করা ও বাংলা শিক্ষক নিয়োগসহ ১০দফা দাবিতে বাঙালিরা রাজভবনের সামনে অবস্থান করেছেন ।বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন পরিচালনার জন্য ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষী উন্নয়ন সমিতিগঠিতহয়েছে। বাংলা জনজাগরণ অভিযান শুরু করেছেন তাঁরা।সংগঠনের রাজ্য সভাপতি অচিন্তম গুপ্ত রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেছেন,‘ঝাড়খণ্ড ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে একটি বাংলাভাষী অঞ্চল এবং রাজ্যের ২৪টি জেলার মধ্যে ১৬টি জেলাতে যোগাযোগের প্রধান ভাষা বাংলা ।।গত ২৫ বছর ধরে একের পর এক রাজ্য সরকার বাংলা পাঠ্যপুস্তক বন্ধ করে,বাংলাভাষী শিক্ষক নিয়োগে বাধা দিয়ে এবং অবশেষে ক্রমহ্রাসমান বাংলা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যাযুক্ত স্কুলগুলি বন্ধ করে দিয়ে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করে চলেছে ।

বিধায়ক অরূপ চ্যাটার্জী ঝাড়খণ্ড বিধানসভায় বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উথ্থাপন করেন।এই একাডেমি বিদ্যালয়গুলিতে বাংলা শিক্ষাদান,বাংলা বই মুদ্রণ,বাংলা শিক্ষক নিয়োগের বিষয় পরিচালনা করতে পারবে ।ঝাড়খণ্ড বাংলা ভাষা উন্নয়ন সমিতি গত ১০ এপ্রিল থেকে আর একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।সেটি হল প্রশাসনিক স্তরে আন্দোলনকে প্রসারিত করা।তাঁরা পূর্ব সিংভূম জেলার ঘাটশিলা,মুসাবনি,চাকুলিয়া ,জামশেদপুর,পটমদা,বড়াম,ধলভূমগড়,পোটকাসহ সমস্ত ব্লকে তাঁদের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করেন।পটকা প্রখণ্ড বিকাশ পদাধিকারীর মাধ্যমে এই স্মারকলিপি প্রদানের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন জেলা কাউন্সিলার করুণাময় মণ্ডল ও প্রতিমা মণ্ডল , শিক্ষাবিদ রাজকুমার গুপ্ত,মাতাজি আশ্রমের সভাপতি কৃষ্ণপদ মণ্ডল,ডাক্তার সুন্দরলাল দাস,বীরগ্রামের গ্রাম প্রধান অবন্তী পাত্র এবং তপনকুমার মণ্ডল,চণ্ডীরাম গোপ,চন্দনকুমার ভকত,বিমলচন্দ্র ভকত,অমিত পাত্র,বীরবল সরদার,দীনেশকুমার দাস,সমীরকুমার গোপ প্রমুখেরা।প্রখণ্ড বিকাশ পদাধিকারী স্মারকলিপি গ্রহণ করার সময়ে সংগঠনের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।বিশেষ করে শিক্ষাদানের জন্য তাঁরা যে পটকার প্রতি গ্রামে ‘অপুর পাঠশালা’ খুলেছেন এবং এরকম ৩০টি পাঠশালা যে চালু আছে , তার কথা বলেছেন তিনি।আগামী দিনে সারইকেলা-খরসওয়া জেলার সমস্ত ব্লকে দেওয়া হবে স্মারকলিপি ।

উল্লেখযোগ্য যে ঝাড়খণ্ড বাংলা ভাষা উন্নয়ন সমিতির চাপে মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়ে ঝাড়খণ্ড সরকার একটি সমীক্ষা করেছিল।সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছিল যে ১৫টি জেলার লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া মাতৃভাষা বাংলায় লেখা-পড়া করতে চায়।কিন্তু সরকার সেই রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করেন নি।

You might also like