ডিজিটাল যুগে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

সংগ্রাম দত্ত: আজকের এই অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক,আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি এখন ক্রমশ সাম্প্রদায়িক উস্কানি,গুজব ও সহিংসতা ছড়ানোর এক বিপজ্জনক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য কারো নাম ও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে,কখনো বা আইডি হ্যাক করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন উসকানিমূলক পোস্ট করে।এরপর সেই পোস্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।যার ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ,আতঙ্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়।ফলে হঠাৎ করেই সংঘবদ্ধভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশেষ করে হিন্দুদের বাড়িঘর,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলা চালানো হয়।এসব হামলায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।তদন্তে দেখা যায়, যে ব্যক্তির নাম বা ছবি ব্যবহার করে পোস্ট করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তিনি এসবের সঙ্গে জড়িত নয়—বরং অপরিচিত কেউ ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলেই এসব ঘটিয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই নির্দোষ ব্যক্তিকেই গ্রেপ্তার করে, যার নাম বা ছবি ব্যবহার হয়েছে। অথচ যারা ভুয়া আইডি খুলেছেন, উস্কানি দিয়েছেন ও হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক চক্রকে আরও বেপরোয়া করে তোলে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একধরনের স্থায়ী ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। অনেকে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সন্ধানে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ দেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার সংরক্ষিত থাকার কথা বলা হয়েছে।রামু (২০১২) থেকে শুরু করে গঙ্গাচড়া (২০২৫) সাম্প্রদায়িক সহিংসতা পর্যন্ত—গত ১৩ বছরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে একই ধরনের কৌশল ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।বুদ্ধিজীবী মহলের প্রশ্ন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে নজরদারি ও তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে কেন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না?

২০২৫ সালের ২৮ জুলাই আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা বিবিসি বাংলা গংগাচড়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন যে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ যেই ফেসবুক পোস্ট ঘিরে উঠেছে, তা কোনো ভেরিফায়েড পেজ থেকে করা হয়নি। ওই কিশোর আসলেই ফেসবুকে ওই পোস্ট করেছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। তবে মাইক ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ছড়িয়ে লোক জড়ো করা হয়েছে। এটি করেছে গঙ্গাচড়ার পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলার একটি গোষ্ঠী,”—বলেন এক সাংবাদিক, যিনি ঘটনাস্থলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন।যদি সরকার প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচার না করে,এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কার্যকর, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেয়—তবে এই ভয় ও সহিংসতার চক্র অব্যাহত থাকবে। সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হলে ঘৃণার এ জাল গুটিয়ে ফেলতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব।

You might also like