তিন বিভাগের বৃষ্টিতে ৭ জেলায় বন্যার শঙ্কা
নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী
ঢাকাঃ পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপটি উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। তাই এর কেন্দ্রের কাছের এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে। এছাড়াও দেশের তিন বিভাগ এবং উজানে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সাত জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।অন্যদিকে, নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে দমকা বা ঝড়ো হওয়া বয়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। আর দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি) জানায়, আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ওপর একটি শক্তিশালী মৌসুমি বৃষ্টিবলয়ের প্রভাব থাকতে পারে। এর ফলে দেশের ৮০ শতাংশ এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আর এটি চলতি বছরের ১৩তম এবং মৌসুমি বৃষ্টি বলয়গুলোর মধ্যে নবম। বিশেষ করে, দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।বিডব্লিউওটি জানায়, এই বৃষ্টিবলয়টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগ। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে এর প্রভাব বেশ সক্রিয় থাকবে।অন্যদিকে, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে এর প্রভাব মাঝারি থাকতে পারে। এই সময়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে তীরবর্তী নিচু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। এ ছাড়া, অনেক স্থানে জলাবদ্ধতাও তৈরি হতে পারে।অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, আগামী তিনমাস দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে একাধিক লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেওয়ারও শঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (বর্ষা) পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পারে। অক্টোবর মাসে স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। এছাড়া সারাদেশে ৩-৬ দিন মাঝারি থেকে তীব্র বিজলীসহ বজ্রবৃষ্টি এবং ৪-৮ দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বিজলীসহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।নভেম্বর-ডিসেম্বরে শীতের আগমন ও শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কার বিষয়ে সংস্থাটি জানায়, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে এবং কুয়াশার প্রকোপ বাড়বে। এর ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকবে এবং শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও ও নদ-নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। সেই সঙ্গে ডিসেম্বর মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে ১-২টি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ (০৮-১০ ডিগ্রি সে.) বয়ে যেতে পারে।
বুধবার কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে ভারি বৃষ্টি হতে পারে। আর চট্টগ্রাম, ফেনী, লালমনিরহাট, নীলফামারী, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভন ওই পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপের সৃষ্টি হয়েছে। এটি আগামী ২৪ ঘণ্টায় পশ্চিম-মধ্য ও তৎসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে এবং আগামী ৪৮ ঘন্টার দক্ষিণ উড়িষ্যা-উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম প্রদেশে ভারি থেকে অতি-ভারি বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে ৪ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সংলগ্ন উজানে ভারতের প্রদেশে বিচ্ছিন্নভাবে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
৭ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে এতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহরী, সেলোনিয়া ও ফেনী নদীগুলোর পানি সমতল গত ২৪ ঘন্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই নদীগুলোর পানি সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে।এ সময়ে মুহুরী ও সেলোনিয়া নদী ফেনী জেলায় বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে; অপরদিকে ফেনী নদী চট্টগ্রাম জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
রংপুর বিভাগের ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল গত ২৪ ঘন্টায় হ্রাস পেয়েছে এবং তিস্তা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে জানিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রে বলছে, নদীগুলোর পানি সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। এ সময়ে তিস্তা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
ময়মনসিংহ বিভাগের কংস নদীর পানি সমতল গত ২৪ ঘন্টায় হ্রাস পেয়েছে এবং সোমেশ্বরী ও ভূগাই নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে জানিয়ে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ নদীগুলোর পানি সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। এ সময়ে সোমেশ্বরী, ভূগাই-কংস নদীসমূহ শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
কেন্দ্রের মঙ্গলবারের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, ২ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে ৫ অক্টোবর সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, আপার করতোয়া-আপার আত্রাই, আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ঘাঘট, মহানন্দা, যমুনেশ্বরি ও করতোয়া নদীর পানি সমতল দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকুলীয় নদীসমূহে স্বাভাবিকের থেকে উচ্চতর জোয়ার বিরাজমান আছে, যা আগামী ৩ দিন অব্যাহত থাকতে পারে।এদিকে পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও এর আশপাশের এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার বার্তা দিয়ে আবওহাওয়া অধিদফতর বুধবার সকালে জানিয়েছে, এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিম্নচাপটি বুধবার বেলা ৩টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১৫ কিলোমিটার, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৬৫ কিলোমিটার, মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৮০০ কিলোমিটার এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্র বন্দরসমূহের ওপর দিয়ে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।স্বল্প সময়ের নোটিশে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ রেখে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে আবওহাওয়া অধিধফতরের পক্ষ থেকে।বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একইসঙ্গে সারাদেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। এছাড়া সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।