নির্বাচনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে দল-বদলের খেল
দিলীপ মজুমদার
[২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল।৪ মে ফলাফল প্রকাশিত হল।তৃণমূল দল পরাভূত।বিপুলভাবে জয়ী বিজেপি।এই রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হল ডাবল এঞ্জিন সরকার। তারপরেই তৃণমূলের সাংসদ ও বিধায়কদের দল-বদলের খেলা শুরু । কেউ বলেন অপারেশন লোটাসের খেলা ]
ফেসবুকের একটা পোস্টে আটকে গেল চোখ।সেই পোস্টে একজন লিখছেন:আমি জাতিতে চণ্ডাল,মুটে মজুর,রিকশাওয়ালা,ডোম,সুইপার।হোটেলে খেয়ে গামছা বিছিয়ে রেলস্টেশনে শুয়ে থাকা একজন।আমাদের শিক্ষা নেই,সংস্কার নেই,শিষ্টাচার সৌজন্য জানি না।আমরা রেগে গেলে চিৎকার করি,ঝগড়া করি,খিস্তি-খাস্তা দেই।বাবু ভদ্দোরেরা আমাদের এই সব কত কি বলে।কত নিন্দা-মন্দ করে। কথিত ভদ্রবিত্তের লোকেদের কাছে আমরা ছোটজাত—ছোটলোক।ঘৃণিত,নিন্দিত মানবেতর প্রাণী।মানছি সব মানছি । মানছি যে আমাদের অনেক দোষ আছে।কিন্তু আমরা ওইসব ভদ্দোর লোকেদের মতো নিমকহারাম ,বেজম্মা,বেইমান নই।যারা যে পাতে খায় সেই থালাকে খাবার পরে দূর করে ছুঁড়ে ভাগাড়ে ফেলে দেয় ।অর্থের জন্য,স্বার্থের জন্য যারা নিজের গর্ভধারিণী মাকেও পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে পেছুপা হয়না ।
আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে আজ ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এইরকম ছোটলোক ছোটজাত বানিয়েছেন বলে । যাদের চোখে কোন পর্দা নেই,লজ্জা সরম নেই,ভাগ্যিস আমাকে ওই বাবু ভদ্দোর শিক্ষিত লোক বানান নি।আজকাল ঘেন্না ধরে যাচ্ছে বাবু ভদ্দোরলোকেদের রকমসকম স্বভাবচরিত্র দেখে।কিসের শিক্ষা ? কিসের সংস্কৃতি ? ন্যায়-নীতি নিয়ে কিসের এত বড় বড় কথা।এঁদের যে চামার চশমখোর বলে বলে গাল দেব, সেও পারছিনা ।কারণ চামার একটা শ্রমজীবী শ্রেণির নাম।এরা তাদের চাইতে অনেক অধম,নিকৃষ্ট,জঘন্য । মাইরি বলছি,এদের কথা মনে আসলে ঘেন্নায় থুতু উঠে আসছে।এখন আবার যেখানে-সেখানে থুতু ফেললে জরিমানা গোনা লাগবে।না হলে ফচাৎ করে ওদের মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিতাম ।
ঠিক কোন কারণে লেখক বাবু ভদ্দোরলোকেদের উপর চটে গেছেন,সে কথায় পরে আসছি।কিন্তু লেখকটি কে ? নাম – মনোরঞ্জন ব্যাপারী।তার মানে হুগলির বলাগড়ের প্রাক্তন বিধায়ক সেই মনোরঞ্জনবাবু? মনোরঞ্জন ব্যাপারী ? দলিত সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী ?জন্ম তাঁর ১৯৫০ সালে।বাংলাদেশের তুরুকখালি গ্রামে।দেশভাগের পরে চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে।নানা জায়গায় উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাস করেছেন।ভারতের নানা জায়গায় নামমাত্র পারিশ্রমিকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।জীবিকার সন্ধানে চলে গিয়েছিলেন দণ্ডকারণ্যে।প্রতি পদে দেখেছেন বর্ণবৈষম্যমূলক অপমান।মধ্যভারতে নকশাল আন্দোলনের ও শ্রমিকনেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর প্রভাব পড়েছে।রাজনৈতিক কারণে কাটাতে হয়েছে কারাগারে।সেখানেই তিনি সামান্য লেখাপড়া শিখেছেন।জেল থেকে মুক্তি পাবার পরে আবার জীবিকার সংগ্রাম।কখনও মালবাহক,কখনও কুলি,আবার কখনও মজুর।কলকাতায় রিকশা চালানোর সময়ে একদিন মহাশ্বেতাদেবীর সঙ্গে আলাপ ।তাঁর অনুপ্রেরণায় লেখা শুরু।এক এক করে প্রকাশিত হয়েছে :ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন ( ২খণ্ড),অন্য ভুবন,বৃত্তের শেষ পর্ব,অমানুষিক,জিজীবিষার গল্প।মতুয়া এক মুক্তি সেনা , মরণ সাগর পারে তোমরা অমর ,গল্প সমগ্র … ।পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৪ সালে তিনি লাভ করেন সুপ্রভা মজুমদার স্মৃতি পুরস্কার ।
এবার আসি বাবু ভদ্দোরলোকেদের প্রতি মনোরঞ্জনবাবুর ঘৃণা ও ক্রোধের ব্যাপারে। নিশ্চয়ই সাময়িক কোন ঘটনায় তিনি ভীষণ রেগে এইসব লিখেছেন ।সাময়িক একটা ঘটনা তো আছেই।মনোরঞ্জনবাবু যে দলের বিধায়ক ছিলেন,সেই দল এবার নির্বাচনে পরাজিত।পরাজয়ের পরেই দেখা গেল সে দলের বিধায়ক,সাংসদরা বিজয়ী দলের দিকে ছুটে চলেছেন।আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান।তা যান।কিন্তু কৈফিয়ৎ হিসেবে তাঁরা বলে চলেছেন প্রাক্তন দলের দুর্নীতির , স্বৈরাচারের কথা।তাঁদের দল জিতে গেলে কি বলতেন এসব ? না,বলতেন না।তাহলে দলবদল কেন ? ভয়ে ও প্রলোভনে।না ,. সেকথা স্বীকার করবেন না।স্বীকার করতে পারবেন না বলেই আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রাক্তন দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার।কি না,দলটা ভরে গেছে দুর্নীতিতে।মানলাম,ঠিক কথা।কিন্তু দলে থাকতে থাকতে বলেন নি কেন ? দল জয়লাভ করলে কি বলতেন ? কি না, দলে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।বায়ু চলাচলের পথ তৈরির চেষ্টা করেছিলেন কি ? তখন কিচ্ছু বলেন নি,হাত কচলে হেঁ হেঁ করে গেছেন,তাহলে আজ কেন।বেশ তো,মেনে নিলাম আপনাদের সব কথা ।এবার বলুন,দল থেকে পদত্যাগ করে,সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে নতুন করে অংশগ্রহণ করলেন না কেন নির্বাচনে ? তাহলে তো কারও কিছু বলার থাকত না।আপনাদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকত।তা নয়,আপনারা গাছেরও খাবেন,তলারও কুড়োবেন।আসলে ভদ্দোরলোক আপনারা মুখোশধারী ।
মনোরঞ্জনবাবু ফেসবুকে লিখছেন :ভাবা যায়—যে মানুষ তাঁদের সমাজে অর্থ-বিত্ত , মান-সম্মানের এত উচ্চশিখরে পৌঁছে দিয়েছেন , তাঁদের শতেক অন্যায়- অপরাধ- অনৈতিক কাজকর্ম দেখেও ক্ষমাসুন্দর ভঙ্গিতে চোখ বুজে থেকেছেন,সেই মানুষের আশ্রয়ে দশ-বিশ বছর থেকে-খেয়েদেয়ে তাজা মোটা হয়ে আজ তাঁর বিপদের দিনে নির্লজ্জতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে কেন এভাবে তাঁকে একা ফেলে দলে দলে শত্রুশিবিরে চলে গেল ! পিছনে চাকু চালিয়ে দিতে একটু বিবেকের দংশন হল না ? হাত কেঁপে উঠল না? এমনটাতো কোন চোর-ডাকাত-খুনিও কোনদিন করতে পারবে না ।
এরই নাম বেইমানি ।
আর ঠিক এইখানেই রাগ মনোরঞ্জনবাবুর ।ঠোঁটকাটা মানুষ তিনি বরাবর।দলে থেকে দলের সমালোচনা করেছেন।তাঁর নানা মন্তব্যের জন্য দল অস্বস্তিতে পড়েছে।কখনও ফেসবুকে বিদ্রোহী পোস্ট দিয়েছেন,কখনও নিজের সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবাত্মক বিবৃতি দিয়েছেন,কখনও দলের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন,কখনও রাজ্যের জন্য আলাদা পতাকার দাবি করেছেন,শাসক শিবিরে তিনি যে ‘বিতর্কের ব্যাপারী’ সেকথা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।আর এসবের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার টিকেট পান নি।অভিমান হয়েছিল তাঁর। স্বাভাবিক।কিন্তু তিনি বেইমানি করেন নি।উপকারীর অপকার করে যে,কি যেন বলে তাকে ? বলে ==কৃতঘ্ন ।
বড্ড রাগ মনোরঞ্জনবাবুর।ভালোবাসা বিরাট বলে রাগও ভীষণ।মানুষের প্রতি ভালোবাসা ।অমানুষের প্রতি রাগ।তিনি ভীষণ রেগে ভীষণ ভালোবেসে লিখছেন :আমি শখের বসে লিখি না।আমি ক্রুদ্ধ,আমার প্রতিটি লেখাই ক্রোধের ফসল।আমার তো লেখক হওয়ার কথা ছিল না , তাহলে কেন আমি কলমবাজ হতে চাইলাম ? আমি এই পৃথিবীকে শিশুদের বসবাসের উপযোগী করে তুলতে চাই।তাই আমি চাই আমার বিরোধীরা মরে যাক।যদি আমি সমাজের শত্রুদের গলা কাটতে পারতাম,তাহলে আমি লিখতাম না।আমি প্রতিটি বইয়ে একটি জঘন্য ঘৃণ্য চরিত্র সৃষ্টি করি এবং সেই ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করি ।এটা আমাকে কিছুটা মানসিক শান্তি দেয়।আমি চাই আমার হৃদয়ে যে ক্রোধের আগুন জ্বলছে , তা আমার পাঠকদের হৃদয়েও জেগে উঠুক।( প্ল্যাটফর্ম ম্যাগে সাক্ষাৎকার )না,মনোরঞ্জনবাবু,তা হবে না।আপনার পাঠক আমাদের আজ রাগ নেই।আজ আমরা বীতরাগ।ভাগাভাগি ভাঙাভাঙির খেলা চলছে,আমাদের রাগ নেই।অবৈজ্ঞানিক,অনৈতিহাসিক কথার মালা শুনে আমাদের রাগ হয় না।আমার বঁধুয়া আমারই আঙিনা দিয়ে আন বাড়ি যাচ্ছে দেখে রাগ হয় না আমাদের।আমরা মধ্যবিত্ত ভদ্দরলোক।আমাদের দ্বিচারিতার শেষ নেই।আমরা মাতৃভাষার সপক্ষে গলা ফাটাই কিন্তু নিজের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে পড়াই।আমরা ডায়ালেকটিক্যাল মেটিরিয়ালিজমের কথা বলি কিন্তু ঘরে পুজোআচ্চা বজায় রাখি।নিম্নবিত্তের প্রতি আমাদের দরদের অন্ত্য নেই,কিন্তু তাদের ঘামের গন্ধে বমি আসে আমাদের।জাতীয় সংহতি নিয়ে আমাদের বক্তৃতা দারুণ উদ্দীপক,কিন্তু মনের গোপনে বিভাজনটা বজায় রাখি।আমাদের উপলব্ধির সঙ্গে কথার,কথার সঙ্গে কাজের মিল খুঁজে পাবেন না ।