পাথরখেকোদের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে পাঁচশ বছরের জাফলং রাজবাড়ী
সংগ্রাম দত্ত
সত্যবাণী
সিলেট: সিলেট বিভাগের জাফলং মানেই পাহাড়, নদী আর পাথরের অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই নীরবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এক অমূল্য সাক্ষী—প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী। শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজ নদীভাঙন, অবৈধ পাথর উত্তোলন ও অবহেলার নির্মম শিকার।জাফলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবাড়ীটির দিকে তাকালে এখন আর অতীতের গৌরব পুরোপুরি অনুভব করা যায় না। কারণ এর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। যে অংশটুকু এখনও টিকে আছে, সেটিও সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে।ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্টেং রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগের সময়ে জৈন্তিয়া অঞ্চল কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে জাফলং, জৈন্তাপুর, চারিকাটা ও ফালজুর ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের কোনো এক সময়ে এসব খণ্ডরাজ্য একীভূত হয়ে বৃহত্তর জৈন্তিয়া রাজ্যের জন্ম হয়। তখন জৈন্তাপুরের নিজপাট হয়ে ওঠে রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী। আর জাফলংসহ অন্য রাজধানীগুলো ধীরে ধীরে প্রশাসনিক গুরুত্ব হারায়।
তবে জাফলংয়ের এই প্রাচীন রাজধানী পরিত্যক্ত হলেও নিশ্চিহ্ন হয়নি। বরং প্রকৃতির বুকেই শত শত বছর ধরে টিকে ছিল এর স্থাপত্য। ধারণা করা হয়, জৈন্তিয়ার রাজারা মাঝেমধ্যে এখানে অবস্থান করতেন এবং স্থাপনাগুলোর সংস্কারও করাতেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রাজবাড়ীটি তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।কিন্তু ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর শুরু হয় এর অবক্ষয়ের ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ সময়জুড়ে জৈন্তিয়ায় নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মিত হয়নি। বরং ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে পুরনো রাজপ্রাসাদ, দালান ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো।
স্বাধীনতার পরও সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ভয়াবহতা। জাফলং নদীর বুক থেকে নির্বিচারে পাথর তোলার ফলে বদলে গেছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। এতে নদীভাঙনের তীব্রতায় রাজবাড়ীর মূল অংশ ইতোমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে।বর্তমানে কোনোভাবে টিকে আছে রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশের দেয়াল ও রাজকীয় ফটক। পূর্ব পাশের দেয়ালের অর্ধেক অংশ এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। পূর্বদিকের প্রবেশ ফটকটিও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। তবে পশ্চিম ও উত্তর পাশের দেয়াল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বহু আগেই।স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতেই জাফলং রাজবাড়ীর অবশিষ্ট অংশও হারিয়ে যাবে নদীর গর্ভে। অথচ এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
কিছু ঐতিহাসিকের মতে, জাফলং একসময় ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের রাজধানীও ছিল। নিয়াং রাজা, কল্লং রাজা ও মাইলং রাজার মতো শাসকরা এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করতেন। ধারণা করা হয়, ১৩০০ সালের আগেই সেই রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে এবং পরে এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।প্রকৃতি আর ইতিহাসের অপূর্ব মেলবন্ধনের এই রাজবাড়ী আজ সংরক্ষণের আকুতি জানাচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটি রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় পড়বে জাফলং রাজবাড়ীর গল্প—দেখার সুযোগ আর থাকবে না বাস্তবে।