বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস: মৌলভীবাজার-৪ আসনে অনিশ্চিত লড়াই
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার-৪ হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার একটি।এটি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত জাতীয় সংসদের ২৩৮ নং আসন। ২০২৪ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার পর থেকে এই আসনে কোনো সংসদ সদস্য নেই।১৯৮৪ সালে সিলেট-১৫ নির্বাচনী এলাকা থেকে মৌলভীবাজার-৪ নির্বাচনী এলাকা গঠিত হয়। তখন বৃহত্তর সিলেট জেলাকে বিভক্ত করে চারটি নতুন জেলা (সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ) গঠিত হয়েছিল।২০০৮ সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন কমিশন ২০০১ সালে আদমশুমারীর প্রতিবেদন অনুযায়ী জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রতিফলিত করার জন্য এ আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে।২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে, নির্বাচন কমিশন কমলগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন (আদমপুর, আলীনগর, ইসলামপুর, এবং শমশেরনগর) এ আসনের সাথে যোগ করে নির্বাচনী এলাকার সীমানা প্রসারিত করেছে।মৌলভীবাজার-৪ আসন (আসন নং ২৩৮) কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলাকে নিয়ে গঠিত। প্রায় ৮৫১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ আসনে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা।
দুটি উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তাদের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসনটিতে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৮২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৯০৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। এ ছাড়া নতুনভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২৩ হাজার ২৩৯ জন।নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ভোটার নিবন্ধনের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়বে।
চা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রভাব:
চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ই নির্ধারক ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।এ আসনের দুই উপজেলায় নির্বাচনের ফলাফল সব সময়ই চা-শ্রমিক ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোটের ওপর নির্ভর করে। বিএনপি’র দুই হ্যাভি ওয়েট , এনসিপির মনোনয়নপ্রত্যাশীসহ প্রার্থীরা ওই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষায় সক্রিয়। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে তারা নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন।বড় ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষায় সক্রিয় রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।যিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ এলাকার উন্নয়নে চা শিল্পাঞ্চলের চা শ্রমিক ও গ্রামে-গঞ্জে সংখ্যালঘু ভোটারদের যোগাযোগ তৎপরতা ইত্যাদির মাধ্যমে আকৃষ্ট করে ভোট নিয়ে আসতে পারবেন তিনি জয় লাভ করবেন। বলা যায় চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের আস্থা অর্জনই হবে বিজয়ের প্রধান চাবিকাঠি।
আওযামী লীগের ঘাটি তবে বিভক্ত ভোটের ইতিহাস :
স্বাধীনতার পর থেকে থেকে দুটি নির্বাচনে প্রায় সাড়ে তিন বছর বাদে সকল সময়ই এ আসন ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। নৌকা মার্কা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়ে এসেছে।জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা মোঃ আহাদ মিয়া ১৯৯১ সাল থেকে চা শিল্পাঞ্চল এলাকায় আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে বিভক্তি আনেন। ফলে পরপর দুটি নির্বাচনে চা বাগান এলাকাগুলোতে তিনি ভোটের হার বৃদ্ধি করেন। এর ধারাবাহিকতা হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী ২০০১ সালের নির্বাচনে চা শিল্পাঞ্চল এলাকায় ব্যাপক ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়িয়া তুলেন। ফলে চা বাগান গুলোতে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া ভোটে তিনিও জাতীয় পার্টির নেতা আহাদ মিয়ার মত ভাগ বসিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চা শিল্পাঞ্চল এলাকাগুলোতে চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের সাথে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
নির্বাচনের ইতিহাস: কে কখন জিতলেন?
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরী নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। তাঁর সাথে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম নেতা ডাক্তার মোঃ আব্দুল আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী, প্রধান বিরোধী দল ন্যাপের প্রফেসর সাইয়িদ মুজিবুর রহমান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী । প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাক্তার মোঃ আব্দুল আলী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং অল্প ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাছে হেরে যান।১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলাকার জনপ্রিয় নেতা মোঃ ইলিয়াস আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের জয়লাভ করে এমপি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ ( মিজান গ্রুপ) এর সত্যেন্দ্র কুমার রায় (এস কে রায়) মই মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মোঃ ইলিয়াস পুনরায় নৌকা মার্কা নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বিতা করে নির্বাচিত হন। ওই সময়ে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে বিপ্লবী নেতা মফিজ আলী তাঁর সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঐ নির্বাচনে বিএনপি বর্জন করেছিল।
১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মোঃ আহাদ মিয়া লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময়ে জাসদ রবের পক্ষ থেকে সুরতুজ্জামান প্রতিদ্বন্দিতা করেন। এ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটের দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।’৯০ এর গণঅদ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কমলগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের উপাধাক্ষ্য আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে ৭৫,৩২১ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। ওই সময় তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির মোঃ আহাদ মিয়া ৬০,২১৫ ভোট পেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতা করে পরাজিত হন।১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে শফিকুর রহমান চৌধুরী নির্বাচিত হন। ওই সময় তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ আসলাম। ওই সময় আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল।১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে উপাধাক্ষ শহীদ (৯১,৮১১) জয়লাভ করেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আহাদ মিয়া (৫৯,৮২৫) ।২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক (৯৬,৩২৯) নিয়ে জয়লাভ করেন। ওই সময় তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী (৭০,৩৬৪) । বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ও শিল্পপতি মহসিন মিয়া মধু (৩৪,৭২৬) ধানের শীষ প্রতীক ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো: আছকির মিয়া (১৬,৯৭৫) লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপাধাক্ষ আব্দুস শহীদ (১,৩১,৭৪০) আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে মুজিবুর রহমান চৌধুরী (৭৯,৫৯৯) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগের ১৫১ জন সারাদেশে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচিত হন। ওই সময় শ্রীমঙ্গল- কমলগঞ্জ আসনে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপাধাক্ষ শহীদ (২,১৬,৬১৩) নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মুজিবুর রহমান চৌধুরী (৯৩,২৯৫) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপি’র নেতৃত্বে ঐক্যজোট নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু এই নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হওয়া নিয়ে দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়াসহ দেশে ও বিদেশে সমালোচনা রয়েছে।২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে । ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপাধাক্ষ আব্দুস শহীদ নৌকা প্রতীক নিয়ে তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে খুব সহজেই পরাজিত করে নির্বাচিত হন।
২০২৪ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন-
২০২৪ সালে ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মৌলভীবাজার -৪ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ওইসব রাজনৈতিক দলের বেশ কজন নেতাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা দেখা-সাক্ষাৎ এলাকায় মিছিল মিটিং সহ বিভিন্ন ধরনের সভা সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে।
প্রধান দল গুলোর অবস্থা:
আওয়ামী লীগ:২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অবস্থা নড়বড়ে।দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ কারাগারে।সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ভানু লাল রায়সহ অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার, বেশিরভাগ নেতাই আত্মগোপনে। কর্মী ও সমর্থকরা হতাশাগ্রস্ত। ফলে সাংগঠনিক তৎপরতা কার্যত স্থবির।
বিএনপি:২০০৮ সাল থেকে দলটি রাজনীতির মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই নেতা—
আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী: ২০০১ সালে স্বতন্ত্র এবং ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০০৬ সালের পর থেকে তিনি রাজনৈতিক কারণে মোট ২০ বার জেলে গেছেন। একবারে তিনি এক বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় জেলে কাটান। জেলে থাকাবস্থায় তাঁর ছোট ভাই, যিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ছিলেন, মারা গেলে তিনি বিশেষ অনুমতিতে মুক্তি পেয়ে দাফনের জন্য বাড়ি আসেন। তাঁরও রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৫ বার জেলে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে দুইবার যথাক্রমে ছয় মাস ও তিন মাস করে, মোট ৯ মাস জেল খেটেছেন। চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু এলাকায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
মহসিন মিয়া মধু: তিনি একজন সাবেক পৌর মেয়র ও শিল্পপতি। ১৯৮৪ সালে পৌর কমিশনার হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩, ১৯৯৮, ২০১১ এবং ২০২১ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি চা-শ্রমিক, সংখ্যালঘুসহ সকল সম্প্রদায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।রাজনৈতিক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এবং এজন্য তাঁকে কারাভোগও করতে হয়েছে।দুই নেতা গণসংযোগ, মিছিল-মিটিং, চা শিল্পাঞ্চল, শহর ও গ্রামাঞ্চল এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তবে বিএনপি এখনো দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।
জামায়াতে ইসলামী:
সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। প্রার্থী ঘোষণা করেছে—সিলেট মহানগরীর প্রথম সারির নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুর রব। তিনি এলাকায় বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমস্যা সমাধানে তাঁর দল বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলেও জানা গেছে।
এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি):
নবগঠিত দল হলেও এর কেন্দ্রীয় নেতা প্রীতম দাশ দীর্ঘদিন ধরে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনে সক্রিয় আছেন। আন্দোলনের কারণে তিনি বেশ কয়েকবার আটক হয়েছেন এবং বিগত সরকারের আমলে প্রায় পাঁচ মাস কারাভোগ করেছেন।তিনি নিয়মিত চা-শ্রমিক, সংখ্যালঘু, মৎস্যজীবী সম্প্রদায়সহ সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তরুণ এই নেতা প্রার্থী হলে সংখ্যালঘু সহ সকল শ্রেণির ভোট আনার চেষ্টা করবেন।
জাতীয় পার্টি:
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ‘৯০ দশক পর্যন্ত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে এ আসনে ভোটারদের মাঝে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি মোঃ মফিজ আলী, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রভাবশালী নেতা মোঃ আহাদ মিয়া নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন।২০০১ সালে নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মোঃ আছকির মিয়া লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৬,৯৭৫ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। মোঃ আছকির মিয়া জাপা ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ফলে এ আসনের প্রধান দলটির বেশিরভাগ নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে যোগদান করায় ক্রমান্বয়ে জনসাধারণের মাঝে দলটির প্রভাব কমতে থাকে। তবে এ দলটি থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে কোন নেতারই তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে বর্তমানে এ দলের কর্ম তৎপরতা বৃদ্ধি করা হবে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
হেফাজতে ইসলাম ও গণ অধিকার পরিষদ:
শুধু সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে—নুরে আলম হামিদি (হেফাজত) ও হারুনুর রশীদ (গণ অধিকার পরিষদ)। সাংগঠনিক তৎপরতা এখনও সীমিত।
বাম জোটের অতীত ও বর্তমান অবস্থা:
স্বাধীনতার আগে ও পরের সময়ে এ আসনে ন্যাপ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ন্যাপ নেতৃত্বের ভূমিকায় জনগণের মধ্যে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিল। দলের সাংগঠনিক কাঠামো তখন মূলত গ্রাম ও অঞ্চলভিত্তিক নেতা-কর্মীদের উপর নির্ভরশীল ছিল। সক্রিয় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে ন্যাপ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ভূ-দৃশ্যের পরিবর্তন এবং পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দমনের ফলে ন্যাপের প্রভাব ক্রমশ কমতে থাকে। এই সময়ে দেশের রাজনীতিতে বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব সীমিত হয়ে আসে। বর্তমানে ন্যাপ, সিপিবি, গণফোরাম, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ অন্যান্য বাম দলের কমিটি থাকলেও তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা আগের মত দৃঢ় নয়।যদিও কিছু নেতাকর্মী ও সমর্থক এখনও জনগণের মাঝে সুনাম রয়েছে, বর্তমান রাজনীতিতে এই দলগুলোর কার্যক্রম অনেকটা নিঃশব্দ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় প্রভাব ও ভোট সংগ্রহের সুযোগের অভাব তাদের নির্বাচনী শক্তিকে কঠিন করে তুলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অর্থায়নভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবেশে তারা প্রায়শই পিছিয়ে পড়ছে।ফলশ্রুতিতে, অতীতের শক্তিশালী বিরোধী দল আজ ভোটের মঞ্চে তার প্রভাব হারাচ্ছে। বামপন্থী দলগুলোর জন্য বর্তমান সময়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হলেও, তাদের ঐতিহ্য এবং জনমতের প্রতি প্রভাব এখনও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান।
প্রধান নির্বাচনী ইস্যুসমূহ-
চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জন:
শ্রমিকদের কল্যাণ, সুবিধা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা:
সমাজে শান্তি, সামাজিক সংহতি এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা নির্বাচনী ইস্যু ।
চা শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন ও জীবনমান বৃদ্ধি:
চা-বাগান এলাকার অবকাঠামো, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি:
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।
নির্বাচন নিয়ে সংশয়-
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ যাবৎ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। হত্যা, মব জাস্টিস, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন ইস্যু তুলে হানাহানি ও উন্মাদনা, রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কিনা এ নিয়ে অভিজ্ঞ মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে।
উপসংহার:
শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আসনের নির্বাচনী সমীকরণ সব সময়ই চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ এখানে বারবার জয়ী হলেও প্রতিবারই বিএনপি, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা অন্যরা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতারা কারাগারে, বিএনপি ও নতুন দলগুলো নির্বাচনী মাঠ গরম করেছে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হলেও এবার তারা দুর্বল অবস্থানে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি নির্বাচন হয় তবে এ আসনে তা’ হতে পারে সবচেয়ে বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত এক লড়াই।