বাংলাদেশ যদি ১৯৭১ ভুলে যায়,ইমরান আহমেদ চৌধুরী
নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী
বাংলাদেশঃ মুক্তি থেকে বিশ্বাসঘাতকতার প্রান্তে ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে ঝরেছিল অগণিত প্রাণের রক্ত। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে আনুমানিক ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হন, এবং প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেন (Rummel, Death by Government, 1997)। আমাদের মতো যারা সেই সময় সরাসরি ভুক্তভোগী ছিলাম, তাদের কাছে এগুলো ইতিহাসের পাতা নয়, এগুলো যন্ত্রণার জীবন্ত স্মৃতি। আমি ছিলাম সেই শিশু শরণার্থীদের একজন, যাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল ভারতে। আমার পিতা ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR)-এর একজন কোম্পানি কমান্ডার। তিনি ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ সিলেটে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। আমার ভাই তখন মাত্র সতেরো বছরের কিশোর। তিনি গ্রামে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধে যোগ দেন। ঈদের দিনে পাকিস্তানি সেনারা তাকে আটক করে নির্মমভাবে হত্যা করে, তার মরদেহ ফেলে রাখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর তীরে। আজ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও, আমি হতাশ হয়ে দেখি যে বাংলাদেশ এত ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই দেশ আবারও বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানের গভীর রাষ্ট্র ও ঘাতক শক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ছে। যেন আবারও মুছে ফেলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, শহীদদের রক্তে লেখা ইতিহাস।
১৯৭১: টিকে থাকার সংগ্রাম
মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য নয়; এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হয়, তখন সেটি ছিল সুপরিকল্পিত গণহত্যা। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পরদিন লিখেছিল: “পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সাধারণ মানুষ এমনকি হাসপাতালের রোগীদেরও হত্যা করা হয়েছে (NYT, 27 March 1971)I” ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড তার বিখ্যাত “Blood Telegram”-এ লিখেছিলেন: “গত ২৪ ঘণ্টায় কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর পেয়েছি, যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রয়েছে… এটি আসলে পাকিস্তানি সেনাদের সন্ত্রাসের শাসন।”
বাংলালির জন্য এই যুদ্ধ ছিল সম্মান, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার অধিকার রক্ষার যুদ্ধ। শহীদদের স্বপ্ন ছিল এক সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক, স্বাধীন বাংলাদেশ যেখানে সবাই মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বাধীনতার পরই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডে কলঙ্কিত হলো। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার পরিজনসহ হত্যা করা হয়। এরপর একে একে সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা দখল করল। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা, যারা পাকিস্তানের সহযোগী ছিল, আবার রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরে আসে। খ্যাতনামা গবেষক ড. আলি রিয়াজ উল্লেখ করেছেন: “১৯৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো শুধু সেক্যুলারিজম পরিত্যাগ করেনি, বরং সক্রিয়ভাবে সেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তিগুলোকে পুনর্বাসিত করেছে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল (Islamist Militancy in Bangladesh, 2008) I” জামায়াতে ইসলামীকে বৈধতা দেওয়া হলো, যুদ্ধাপরাধীরা সংসদে আসন পেল। সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজম মুছে ফেলে ধর্মীয় বর্ণবাদ ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। এটি ছিল নিছক আপস নয়, এটি ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। বর্তমান সরকার ও পাকিস্তান: এক বিপজ্জনক নাচ আজকের বাংলাদেশে আমরা আবারও দেখি ইতিহাস বিকৃতির চক্র। সরকার মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেও বাস্তবে পাকিস্তানের সঙ্গে একের পর এক সখ্য গড়ে তুলছে। কূটনৈতিক বৈঠক, বাণিজ্য আলোচনা আর গোপন গোয়েন্দা যোগাযোগে এই সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে এভাবে হাত মেলানো নিছক কূটনীতি নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি অবমাননা। কারণ পাকিস্তান কখনো ক্ষমা চায়নি, কখনো গণহত্যার স্বীকারোক্তি দেয়নি, কখনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। বরং তাদের সামরিক নেতৃত্ব এখনো সেই হত্যাযজ্ঞকে অস্বীকার করে। ড. শর্মিলা বসু তার বিতর্কিত বই Dead Reckoning (2011)-এ পাকিস্তানের অপরাধ অস্বীকারের প্রবণতাকে তুলে ধরেছেন। যদিও তার ব্যাখ্যা ব্যাপক সমালোচিত, তবু সত্য এটাই পাকিস্তান আজও তার অপরাধ স্বীকার করেনি। ব্যর্থ রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ আজ শুধু ইতিহাস বিস্মৃতির ঝুঁকিতে নেই, এটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ারও ঝুঁকিতে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ দুর্নীতির শীর্ষে। গণতন্ত্র ক্রমশ নিপীড়িত হচ্ছে, বিরোধী রাজনীতি স্তব্ধ, সংবাদমাধ্যম শৃঙ্খলিত। অমর্ত্য সেন একবার বলেছিলেন: “গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের নাম নয়; এটি চিন্তার, মত প্রকাশের ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা (The Argumentative Indian, 2005)।” বাংলাদেশে এই স্বাধীনতাগুলো দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি লিখেছে: “বাংলাদেশ এখন এক নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে (The Economist, January 2024) I” এগুলো কোনো সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়; এগুলো ব্যর্থ রাষ্ট্রের উপসর্গ। ব্যক্তিগত বেদনা, জাতীয় সতর্কতা আমার কাছে এটি কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়—এটি ব্যক্তিগত ক্ষত। আমি সেই শহীদের ভাই, যাকে ঈদের দিনে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করেছিল। আমি সেই পুত্র, যার পিতা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমি সেই শিশু শরণার্থী, যিনি ভারতের শরণার্থী শিবিরে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আজ যখন দেখি, বাংলাদেশের শাসকরা পাকিস্তানের সঙ্গে করমর্দন করছে, তখন মনে হয় আমার ভাইকে আবার তিতাসের তীরে ফেলে রাখা হচ্ছে। শহীদদের রক্ত যেন আবারও বিশ্বাসঘাতকতার কাছে হেরে যাচ্ছে। বিবেকের আহ্বান মহাপণ্ডিত জর্জ সান্তায়ানা বলেছিলেন: “যারা অতীত মনে রাখতে পারে না, তারা সেটিকে আবারও পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়।”
বাংলাদেশ যদি ১৯৭১ ভুলে যায়, যদি শহীদদের রক্ত বিস্মৃত হয়, যদি পাকিস্তানি দোসররা আবার রাজনীতির দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে, তবে আমরা শুধু ইতিহাস হারাব না, আমরা জাতির আত্মা হারাব। আমাদের শহীদরা কোনো দিন পাকিস্তানের দোসর, চীন বা অন্য কারও প্রভাবাধীন ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ দেননি। তারা প্রাণ দিয়েছেন যাতে বাঙালি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
উপসংহার: ১৯৭১-এর স্বপ্ন রক্ষা করো
স্বাধীনতার পর পেরিয়ে গেছে ৫৪ বছর। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। যুদ্ধক্ষেত্র শুধু বদলেছে—এবার এটি রাজনীতি, কূটনীতি ও স্মৃতির ভেতরে। আজ প্রশ্ন একটাই: বাংলাদেশ কি শহীদদের স্বপ্ন রক্ষা করবে, নাকি বিশ্বাসঘাতকতার কাছে আত্মসমর্পণ করবে?১৯৭১-এর স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে—শরণার্থীর চোখে, মায়েদের অশ্রুতে, তিতাসের তীরে শহীদদের রক্তে। বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: স্বপ্নকে সম্মান করবে, নাকি বিশ্বাসঘাতকতার পথে হাঁটবে। ইমরান আহমেদ চৌধুরী বি.ই.এম. ১৯৭১-এর শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা ই.পি.আর কোম্পানি কমান্ডারের পুত্র, এবং এক কিশোর শহীদ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার ভাই।