বাণিজ্যিক পেয়ারায় ভারী ধাতু

নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী

রাজশাহীঃ রাজশাহী বিভাগের বাণিজ্যিক বাগানে উৎপাদিত পেয়ারায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক,সিসা ও ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগ্রহ করা ৯০ শতাংশ পেয়ারায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ক্যাডমিয়াম,প্রায় ৭০ শতাংশে সিসা এবং ৩০ শতাংশে আর্সেনিক রয়েছে।এসব পেয়ারায় তামার পরিমাণও বাড়ির বাগানের পেয়ারার তুলনায় বেশি।ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো.সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এ গবেষণা করেন।এতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরও ছয় গবেষক অংশ নেন।গবেষণাটি গত আগস্টে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।২০২৫ সালে রাজশাহী,নাটোর,নওগাঁ,চাঁপাইনবাবগঞ্জ,পাবনা,সিরাজগঞ্জ,বগুড়া ও জয়পুরহাটের ১০টি এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।প্রতিটি এলাকায় একটি বাড়ির বাগান ও একটি বাণিজ্যিক বাগান থেকে পরিপক্ব পেয়ারা সংগ্রহ করে আর্সেনিক,সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।

ক্যাডমিয়ামে বেশি উদ্বেগ

গবেষণায় বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৮৮ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।এর অনুমোদিত সীমা শূন্য দশমিক ০৫ মিলিগ্রাম।অর্থাৎ সর্বোচ্চ নমুনায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।বাণিজ্যিক বাগানের ৯০ শতাংশ নমুনায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়েছে।বাড়ির বাগানের ২০ শতাংশ নমুনাতেও সীমার বেশি ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।সিসার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক পেয়ারায় সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে ২ দশমিক ০৫ মিলিগ্রাম।অনুমোদিত সীমা শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রাম।প্রায় ৭০ শতাংশ বাণিজ্যিক নমুনায় এই সীমার বেশি সিসা পাওয়া গেছে। তবে বাড়ির বাগানের সব নমুনায় সিসার মাত্রা ছিল অনুমোদিত সীমার মধ্যে।আর্সেনিকের সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৮৪ মিলিগ্রাম।এর অনুমোদিত সীমা ১ মিলিগ্রাম।বাণিজ্যিক বাগানের ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে।বাড়ির বাগানের কোনো নমুনায় তা অনুমোদিত সীমার ওপরে পাওয়া যায়নি।এ ছাড়া বাণিজ্যিক পেয়ারায় তামার সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে ৯ দশমিক ০৪ মিলিগ্রাম।অনুমোদিত সীমা ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম।প্রায় অর্ধেক বাণিজ্যিক নমুনায় তামার পরিমাণও নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল।বাড়ির বাগানের সব নমুনায় তামার মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল।গবেষকেরা জানান,পরীক্ষিত চারটি ধাতুর ঘনত্বই বাড়ির বাগানের তুলনায় বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় বেশি পাওয়া গেছে।

শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি

গবেষণায় শুধু পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি নয়, এসব ফল খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের শরীরের ওজন, প্রতিদিন পেয়ারা খাওয়ার পরিমাণ এবং নমুনায় থাকা ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলাফলে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব নমুনাতেই সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।গবেষকেরা বলছেন, শিশুদের শরীরের ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ দূষিত খাবার গ্রহণ করলে তাদের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় ভারী ধাতু প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন অনুমোদিত সীমার বেশি ভারী ধাতু গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।তবে এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে দেশের সব বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারা দূষিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না বলে স্পষ্ট করেছেন গবেষকরা।

দূষণের উৎস এখনো নির্দিষ্ট নয়

পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এসব ধাতু কোথা থেকে এসেছে,তা গবেষণায় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।নমুনা সংগ্রহ করা জমির মাটি ও সেচের পানিতে ভারী ধাতুর মাত্রাও সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি।গবেষকদের ধারণা,দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটিতে ভারী ধাতু জমতে পারে।দূষিত ভূগর্ভস্থ বা উপরিভাগের পানি সেচে ব্যবহার করলেও এসব ধাতু ফসলে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানার নির্গমন ও যানবাহনের ধোঁয়ার মাধ্যমেও পরিবেশে ভারী ধাতু জমতে পারে।দূষণের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাগানের মাটি, সেচের পানি, সার ও কীটনাশকের মান নিয়মিত পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।গবেষণা দলের প্রধান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর প্রবেশ কীভাবে কমানো যায়,সেটিই গবেষণাটির অন্যতম উদ্দেশ্য।কৃষক পর্যায়ে কীটনাশক ও সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।তিনি বলেন,আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ কৃষিচর্চা নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মাত্রায় সার,কীটনাশক ও সেচের পানি ব্যবহার এবং কৃষি পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো গেলে ফল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর দূষণ কমানো সম্ভব।

You might also like