বিস্মৃত নায়ক : ঢাকার সন্তান স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন
সংগ্রাম দত্ত: ভারতবর্ষ আজ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন গণতন্ত্রের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়,তখনও ভারতবর্ষ তার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে।অথচ এই গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনে যিনি সর্বপ্রথম দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেই মানুষটি আজ প্রায় বিস্মৃত— তিনি হলেন সুকুমার সেন (২ জানুয়ারি ১৮৯৯ – ১৩ মে ১৯৬৩), স্বাধীন ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
জন্ম ও শৈশব
সুকুমার সেনের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২ জানুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ঢাকা শহরে। তাঁর পিতা অক্ষয়কুমার সেনও ছিলেন আই.সি.এস কর্মকর্তা। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বর্ধমানে। পড়াশোনা করেন বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে, এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অঙ্কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে আই.সি.এস হন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
দেশ স্বাধীন হলো ১৯৪৭ সালে, ১৯৫০ সালে কার্যকর হলো সংবিধান। তবুও দেশজুড়ে দারিদ্র, উদ্বাস্তু সমস্যা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তখন প্রবল। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সিদ্ধান্ত নিলেন প্রথম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়ের পরামর্শে নেহরু ১৯৫০ সালের ২১ মার্চ সুকুমার সেনকে ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করেন।
প্রথম সাধারণ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ
১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে—
ভোটার ছিল প্রায় ১৭ কোটি, যার মধ্যে ৮৫% নিরক্ষর।
৪৫০০ আসনে ভোট হয়।
২,২৪,০০০ ভোটকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
বানানো হয় প্রায় ২০ লক্ষ ব্যালট বাক্স।
ভোটার তালিকা তৈরির সময় বিশেষত মহিলাদের পরিচয় সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হন সেন। অনেকেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন— তাঁরা ‘অমুকের স্ত্রী’বা ‘অমুকের মা’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইতেন। সেন নীতিগতভাবে ঘোষণা করেন, ব্যক্তিগত নাম ছাড়া ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হবে না। ফলে প্রায় ২৮ লক্ষ নাম বাদ যায়। যদিও বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নারীর ব্যক্তিসত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্র শিক্ষা ও সফলতা
ভোটারদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য সেন বিশেষ প্রচার ব্যবস্থা করেন—
গ্রামে গ্রামে ভিডিও প্রদর্শন,
রেডিওতে প্রচার,
প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে সচেতনতা গড়ে তোলা।
৭৩ দিন ধরে চলা এই ভোটাভিযান (১০ ডিসেম্বর ১৯৫১ – ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) বিশ্বকে বিস্মিত করে। ইলিনর রুজভেল্ট মন্তব্য করেছিলেন— ভারত এক “অসাধারণ পরীক্ষা” দিয়েছে এবং তাতে “পূর্ণ সফলতা” অর্জন করেছে।
বহুমুখী অবদান
সুকুমার সেন দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন (১৯৫৭) পরিচালনা করেন এবং বিদেশে সুদানের নির্বাচনও তত্ত্বাবধান করেন। কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৪ সালে তিনি পদ্মভূষণ পান। পরে তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হন।
মৃত্যু
এই মহান প্রশাসক ও ভারতীয় গণতন্ত্রের নেপথ্য নায়ক পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ১৯৬৩ সালের ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন।
বিশ্লেষণ
ভারতের গণতন্ত্রের সফল যাত্রা কেবল রাজনৈতিক নেতাদের কারণে নয়; বরং সুকুমার সেনের মতো নেপথ্য কর্মীর দৃঢ় নেতৃত্ব ও সৃজনশীল চিন্তার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সমাজে গণতান্ত্রিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য।
উপসংহার
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ক্ষেত্রে সুকুমার সেনের অবদান অমলিন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি আজ প্রায় বিস্মৃত। তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং ভারতীয় গণতন্ত্রের সূচনালগ্নের ইতিহাসকে নতুন করে উপলব্ধি করা।