মানবসেবা নাকি মুনাফার ফাঁদ: চিকিৎসাবিজ্ঞানের করপোরেট রূপ ও মানুষের অসহায়ত্ব

চৌধুরী ফরহাদ।

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সভ্যতায় দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক—চিকিৎসাবিজ্ঞান কি আসলেই মানবকল্যাণের মাধ্যম? নাকি এটি নিছক এক বড় ব্যবসার সুনিপুণ কৌশল? সৃষ্টির শুরু থেকে যে বিজ্ঞানকে মানুষের জীবন বাঁচানোর পবিত্রতম পথ হিসেবে গণ্য করা হতো,পুঁজিবাদী অর্থনীতির আগ্রাসনে তা আজ আক্ষরিক অর্থেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের ফাঁদে পরিণত হয়েছে।উদ্ভাবন ও গবেষণার মূল লক্ষ্য এখন মানুষের রোগ নিরাময় নয়,বরং রোগকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রেখে মুনাফা করা।

⚫ মারণাস্ত্রের মহোৎসব বনাম স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা—
বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকারের তালিকা দেখলেই বোঝা যায় মানবসভ্যতা আজ কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৫-২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে মোট ব্যয় ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২.৮৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩৫২ ডলার খরচ করা হচ্ছে কেবল মারণাস্ত্র তৈরিতে, মহাকাশ গবেষণার নামে আকাশ দখলের প্রতিযোগিতায়। অথচ এর বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর দুই বছরের বৈশ্বিক বাজেট মাত্র ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, জীবন রক্ষার বাজেটের চেয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংসের বাজেট প্রায় ৩০০ গুণেরও বেশি! পরাশক্তিগুলো যদি তাদের যুদ্ধ-বাজেটের মাত্র অর্ধেক অর্থও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষতা ও মরণঘাতী ব্যাধি নির্মূলের মৌলিক গবেষণায় ব্যয় করতো,তবে পৃথিবীতে হয়তো একজন মানুষকেও টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরতে হতো না।কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আর অস্ত্রের বাজারকে চাঙ্গা রাখার মানসিকতা আজ মানবতাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

⚫ বিগ ফার্মার বাণিজ্য: রোগ মুক্তি নয়, নিয়ন্ত্রণই লক্ষ্য—
বিশ্বজুড়ে ওষুধের বাজার ২০২৬ সালে এসে প্রায় ১.৮৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন এমন সব ওষুধ তৈরিতে বেশি বিনিয়োগ করে, যা রোগীকে আজীবন সেবন করতে হয়—যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা স্থূলতা। কারণ, একটি রোগ চিরতরে নির্মূল হয়ে গেলে তাদের বিলিয়ন ডলারের বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বড় বড় কোম্পানিগুলো গবেষণার চেয়ে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করতে এবং ওষুধের বিজ্ঞাপনে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে। অন্যদিকে, দরিদ্র দেশের প্রধান প্রধান রোগগুলোর (যেমন যক্ষ্মা বা ম্যালেরিয়া) স্থায়ী প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই, কারণ সেখানে মুনাফার অঙ্কটা খুবই কম।

⚫ চিকিৎসার নামে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে জুয়াখেলা—
জীবন রক্ষাকারী ওষুধের আকাশচুম্বী দাম আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস রোগীদের অপরিহার্য উপাদান ইনসুলিন কিংবা ক্যানসারের কেমোথেরাপির একেকটি ডোজের দাম বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা স্থূলতা বা ওজন কমানোর আধুনিক ওষুধগুলোর পেছনে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ প্রতি মাসে হাজার ডলার খরচ করছে। বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো ভালো করেই জানে, মানুষকে সুস্থ করার চেয়ে আজীবন ক্রেতা বানিয়ে রাখাই তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি।

⚫ বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র: বেহাল দশা ও সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব—
বৈশ্বিক এই করপোরেট বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষ। আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবা আজ মৌলিক অধিকারের খাতা থেকে মুছে গিয়ে এক চরম বিলাসবহুল পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার দিকে তাকালে কয়েকটি করুণ চিত্র ফুটে ওঠে:
◾ ৭৯.৩% ব্যয় ব্যক্তির নিজের: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩ শতাংশ টাকাই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশয়ায় সর্বোচ্চ।

◾ চিকিৎসার খরচে নতুন দরিদ্র: প্রতি বছর চিকিৎসকের ফি, বাণিজ্যিক ওষুধের চড়া দাম এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে এ দেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

◾ জিডিপির ১.০১% বরাদ্দও অপ্রতুল: ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জিডিপির ১.০১% ছুঁয়েছে। বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ন্যূনতম ৫%-এর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। উপরন্তু, প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে এই বরাদ্দের একটি বড় অংশই বছর শেষে অপচয় হয়।

⚫ সরকারি হাসপাতালের অবহেলা বনাম বেসরকারি ফাইভ-স্টার বাণিজ্য—
আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে এক আকাশ-পাতাল বৈষম্য বিদ্যমান। দেশের বিশেষায়িত ও উন্নত চিকিৎসার প্রায় ৯০% ব্যবস্থা রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিট বা বেড না পেয়ে মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা নোংরা পরিবেশে রোগাক্রান্ত মানুষের কাতরানির দৃশ্য অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। অন্যদিকে, এই সরকারি অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতাল। তারা সেবার চেয়ে মুনাফাকেই শেষ কথা মনে করে। আইসিইউ বা লাইফ সাপোর্টে মৃতপ্রায় রোগীকে আটকে রেখে কৃত্রিমভাবে লাখ লাখ টাকার বিল তোলার ঘটনা নিয়মিত গণমাধ্যমে আসছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভুল চিকিৎসা ও জবাবদিহিতার চরম অভাব।

⚫ ওষুধের কাঁচামাল আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট—

বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করা হলেও, বাস্তবতা হলো ওষুধের কাঁচামাল বা অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (API) আমদানির জন্য আমাদের প্রায় ৯০% বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটের অজহহাত দেখিয়ে দেশের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো জীবনদায়ী ওষুধের দাম জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্ররোচনায় এবং সঠিক নজরদারির অভাবে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে মাত্রাতিরিক্ত দামি ওষুধ লেখেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্য। সরকারি হাসপাতালের ভালো মেশিনটি রহস্যজনকভাবে নষ্ট রেখে রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠিয়ে অপ্রয়োজনীয় টেস্টের বোঝা চাপানো হচ্ছে, যার লভ্যাংশ চলে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে।

শেষ কথা,চিকিৎসাবিজ্ঞান নিজে কোনো ক্ষতিকারক বিষয় নয়, কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিগত দূরদর্শিতার অভাব একে আজ একটি নিখাদ সেবার বদলে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। গ্লোবাল মেডিকেল ট্রেন্ডস রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসার খরচ ২০২৬ সালে আরও ১০.৩% বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সর্বোচ্চ ধাক্কা আসবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে।বাংলাদেশকে যদি এই বেহাল দশা থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে কাগজে-কলমে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি অবিলম্বে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে,ওষুধের বাজারে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে এবং স্বাস্থ্য খাতের বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের এই নীরব রক্তক্ষরণ এবং সর্বস্বান্ত হওয়ার মিছিল কোনোদিনই থামানো যাবে না।লেখক: কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।

You might also like