শাহরিয়ার কবির কবে মুক্তি পাবেন?

আলমগীর শাহরিয়ার

 

সত্তরোর্ধ্ব লেখক,সাংবাদিক,মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ।বয়সজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন।তাঁকে আদালতের নেবার সময় দেখা গেছে কারা অন্তরীণ হবার পর তাঁর স্বাস্থ্য ভগ্নপ্রায়।কুঁজো হয়ে হাটছেন।শরীরের ওজন অস্বাভাবিক রকম কমে গেছে।এরকম অবস্থায় যে কোনও সময় বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাংলাদেশে শিশু কিশোরদের জন্য শ্রেষ্ঠ কিছু লেখা লিখেছেন শাহরিয়ার কবির। নেটাসক্তির যুগপূর্ব সময়ে যখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কিশোরদের নির্মল বিনোদন খেলাধুলার বাইরে পাড়া মহল্লার পাঠাগার কিংবা সাহিত্যানুরাগী কোনও পাঠকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বইপড়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল তখন আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল ‘নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়’, ‘একাত্তরের যিশু’, ‘ব্যভারিয়ার রহস্যময় দুর্গ’ ‘পাথারিয়ার খনি রহস্য’, ‘বার্চবনে ঝড়’, কিংবা আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘সাধু গ্রেগ্ররীর দিনগুলি’ পড়তে পড়তে কল্পজগতে ডুব দেওয়া এবং শাহরিয়ার কবিরকে চেনা। শাহরিয়ার কবিরের সৃজনশীল লেখক সত্তা খুবই শক্তিশালী।

তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্যও উল্লেখযোগ্য। ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়?’ আলোচিত গ্রন্থটির তিনি অন্যতম রচয়িতা। সর্বশেষ, তিনিই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। এভাবে যুদ্ধাপরাধী ও দেশে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদীদের পরিচয় জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন বই লেখে, প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও উগ্রবাদ বিস্তারের আশঙ্কা দেখে বিবেকি দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি গত সরকারের আমলে গুম, খুন থেকে শুরু করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর সমালোচনায়ও মুখর থাকতে দেখা গেছে তাঁকে।শাহরিয়ার কবির তাঁর লেখায় এবং প্রামাণ্যচিত্রে উপমহাদেশে উগ্রবাদ বিস্তারের সাম্রাজ্যবাদী কূটকৌশলের রাজনীতির সুলুকসন্ধান করেছেন একজন অনিসন্ধিৎসু সাংবাদিক ও গবেষক হিসেবে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ যুগান্তর ঘটিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সেই বিচিত্রা পত্রিকায় তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর হাতে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হওয়া অনেকেই পরবর্তীকালে এদেশে সাংবাদিকতা জগতের শীর্ষে পৌঁছেছেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক হয়েছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া শাহরিয়ার কবির আশির দশকে বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যে সংগঠনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হুমায়ুন কবির, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর, সরদার ফজলুল করিম, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মতিন খান, আহমদ ছফা, আনু মুহম্মদ প্রমুখের নাম। শহিদ জননী জাহানারা ইমাম, লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ এদেশে যে বা যারাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, লেখালেখি করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছেন তাদেরই চরিত্র হননে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার করা হয়েছে।

শাহরিয়ার কবিরও তাঁর ব্যতিক্রম নন। নিরন্তর কুৎসা রটানো হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এটা একটা হেইট ক্যাম্পেইন। সেই মিশনের অংশ হিসেবেই আজ তাঁকে বন্দি করা হয়েছে। খুবই হাস্যকরভাবে তাঁর বিরুদ্ধে শাপলা চত্বর ও জুলাই আন্দোলনে হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রায় চলৎশক্তিহীন সত্তরোর্ধ্ব একজন মানুষের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ খুবই পরিহাসমূলক। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রগতিশীল,উদার,মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য আজীবন কাজ করা লেখক ও মানাবাধিকার কর্মীর অবিলম্বে মুক্তি চাই। তাঁর জীবনের নিরাপত্তা চাই।

আলমগীর শাহরিয়ার: লেখক ও গবেষক

You might also like