শেষ দুই কণ্ঠে খারিয়া ভাষা: বিলুপ্তির পথে শতবর্ষের ঐতিহ্য
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক মানচিত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা এক অমূল্য সম্পদ।কিন্তু আধুনিকায়নের ঢেউ,ভাষাগত আধিপত্য আর সীমিত সরকারি উদ্যোগের কারণে এই সম্পদ একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে।এর মধ্যে সবচেয়ে সংকটাপন্ন ভাষার তালিকায় রয়েছে খারিয়া—যা আজ শুধু দুইজন বয়স্ক নারীর কণ্ঠে টিকে আছে।
দুই নারীর ভাষা,গোটা জাতির ইতিহাস: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া চা বাগানে বাস করেন ৭৫ বছরের ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা ও ৮০ বছরের ভেরোনিকা কেরকেট্টা। তারাই বাংলাদেশে একমাত্র জীবিত খারিয়া ভাষাভাষী।তারা না থাকলে এই ভাষা হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে। ভাষাটির কোনো লিখিত রূপ বা বর্ণমালা নেই—যা সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলার মাটিতে:খারিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ আমলে ভারতের ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এনে সিলেটের চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে ঝাড়খন্ডে খারিয়া স্বীকৃত ভাষা,এছাড়াও উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের কিছু অঞ্চলেও এর অস্তিত্ব আছে।
ভাষা হারানোর সঙ্কট শুধু খারিয়াদের নয়:ডয়চে ভেলে ও দি ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—বাংলাদেশে প্রায় ৫১টি আদিবাসী ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৪টি মহাবিপন্ন। অনেক ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই, আর তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষা ছেড়ে চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী ভাষার দিকে। রেমিংটচা ভাষার উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—যেখানে বক্তা মাত্র ছয়জন, কনিষ্ঠতমের বয়স ৫৬।
উদ্যোগ আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়: সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক তৈরি করেছে। কিন্তু খারিয়ার মতো অনেক ভাষা এখনো সেই সুযোগ পায়নি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে “বীর তেলেঙ্গা খারিয়া ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা হলেও বর্ণমালার অভাবে কার্যত সফল হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ:
ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষকরা বলছেন—জাতীয় ভাষা কমিশন গঠন করে নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্ত ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।বর্ণমালা তৈরি ও ব্যবহার শুরু করতে হবে যেসব ভাষায় তা নেই।সাহিত্য, গান, লোকসংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে।গণমাধ্যম ও শিক্ষায় সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে হবে।
সময়ের হিসাব কঠিন:খারিয়া ভাষার কণ্ঠ এখন দুইজন নারীর গলায় সীমাবদ্ধ। তাদের হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে এক টুকরো ইতিহাস, এক টুকরো সংস্কৃতি। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাই সময় থাকতেই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি, নইলে আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না, একসময় এই দেশে খারিয়া ভাষা ছিল।বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ অপরিহার্য। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ভাষাগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব। এটি শুধু একটি জাতিগোষ্ঠীর নয়, পুরো জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব।