শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার-৪) আসনে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের তৎপরতা

সংগ্রাম দত্ত
সত্যবাণী

মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজার-৪ হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার একটি।এটি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত জাতীয় সংসদের ২৩৮ নং আসন। ২০২৪ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার পর থেকে এই আসনে কোনো সংসদ সদস্য নেই।১৯৮৪ সালে সিলেট-১৫ নির্বাচনী এলাকা থেকে মৌলভীবাজার-৪ নির্বাচনী এলাকা গঠিত হয়।তখন বৃহত্তর সিলেট জেলাকে বিভক্ত করে চারটি নতুন জেলা (সিলেট,মৌলভীবাজার,সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জ) গঠিত হয়েছিল।২০০৮ সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন কমিশন ২০০১ সালে আদমশুমারীর প্রতিবেদন অনুযায়ী জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রতিফলিত করার জন্য এ আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে।

২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে, নির্বাচন কমিশন কমলগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন (আদমপুর, আলীনগর, ইসলামপুর, এবং শমশেরনগর) এ আসনের সাথে যোগ করে নির্বাচনী এলাকার সীমানা প্রসারিত করেছে।১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ১৯৭৩ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরী নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। তার সাথে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাক্তার মোঃ আব্দুল আলী ( শ্রীমঙ্গলে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম সংগঠক), প্রধান বিরোধী দল ন্যাপের প্রফেসর সাইয়িদ মুজিবুর রহমান প্রমূখ। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ডাক্তার মোঃ আব্দুল আলী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং অল্প ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাছে হেরে যান।১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলাকার জনপ্রিয় নেতা মোঃ ইলিয়াস আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের জয়লাভ করে এমপি নির্বাচিত হন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের মিজান গ্রুপের সত্যেন্দ্র কুমার রায় ওরফে এস কে রায় মই মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মোঃ ইলিয়াস পুনরায় নৌকা মার্কা নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বিতা করে নির্বাচিত হন। ওই সময়ে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে বিপ্লবী নেতা মফিজ আলী তার সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঐ নির্বাচনে বিএনপি বর্জন করেছিল।১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মোঃ আহাদ মিয়া লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময়ে জাসদ রবের পক্ষ থেকে সুরতুজ্জামান প্রতিদ্বন্দিতা করেন। এ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটের দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।’৯০ এর গণঅদ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কমলগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের উপাধাক্ষ্য আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। ওই সময় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির মোঃ আহাদ মিয়া তীব্র প্রতিদ্বন্দিতা করে পরাজিত হন।

১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে শফিকুর রহমান চৌধুরী নির্বাচিত হন। ওই সময় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ আসলাম। ওই সময় আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল।১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে উপাধাক্ষ শহীদ জয়লাভ করেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আহাদ মিয়া।২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। ওই সময় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবুর রহমান চৌধুরী। বিএনপি’র পক্ষ থেকে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মহসিন মিয়া মধু ধানের শীষ প্রতীক ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে মো: আছকির মিয়া লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপাধাক্ষ আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে মজিবুর রহমান চৌধুরী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগের ১৫১ জন সারাদেশে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচিত হন। ওই সময় শ্রীমঙ্গল কমলগঞ্জ আসনে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপাধাক্ষ শহীদ নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মজিবুর রহমান চৌধুরী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপাধাক্ষ আব্দুস শহীদ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন।কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন এবং ২টি পৌরসভা নিয়ে মৌলভীবাজার-৪ সংসদীয় আসন গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখের উপরে।২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটা পরিবর্তনের পর মৌলভীবাজার -৪ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ওইসব রাজনৈতিক দলের বেশ কজন নেতাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা দেখা-সাক্ষাৎ এলাকায় মিছিল মিটিং সহ বিভিন্ন ধরনের সভা সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে।

বিএনপি’র দুই প্রার্থী নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় সভাস সমিতি ও গণসংযোগ করতে দেখা যাচ্ছে। বিএনপি’র মজিবুর রহমান চৌধুরী ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হেরে যান। ২০০৮ থেকে ২০২৪ এর সরকার পতনের আগ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করতে হয়েছে। তিনি ও তার ভ্রাতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শামীম এর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়েছে। একই দলের অপর নেতা সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মহসিন মিয়া মধু ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি ১৯৮৪ সালেক শ্রীমঙ্গল পৌরসভা কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৩, ১৯৯৮, ২০১১ ও ২০২১ সালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিএনপির এই দুই নেতা জোরেশোরে এলাকায় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা সভা- সমিতি ও সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে বিএনপি এখনো দলীয়ভাবে তাদের প্রার্থীর ঘোষণা করেনি বলে জানা গেছে।জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ২৪-এর আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা সভা সমাবেশ ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে। মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে অ্যাডভোকেট আব্দুর রব আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ।নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি পক্ষ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক প্রীতম দাস জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে । ২০২২ সালের তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দদের অনেকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ আনায় তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। গ্রামাঞ্চল ও চা শিল্পাঞ্চল এলাকায় বসবাসরত লোকদের সাথে প্রতিনিয়তই তিনি দেখা-সাক্ষাৎ ও সভা করে চলেছেন। বুঝাই যাচ্ছে তিনি নির্বাচন করবেন।২০২৪- এর রাজনৈতিক পটে পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ এর সাতবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক কৃষি মন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুল শহীদ এমপি বর্তমানে কারাগারে। বেশিরভাগ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা আত্মগোপনে আছেন। ফলে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে আগামী নির্বাচন নিয়ে তেমন কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

ছোট ছোট দল গুলোর মধ্যে সিপিবি, ন্যাপ , ওয়াকার্স পার্টি ইত্যাদি রয়েছে। তাদের যে কজন নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন তাদের লোকে ভালো বলে জানে চেনে। কিন্তু বর্তমান রুগ্ন রাজনীতি ও অঢেল টাকা পয়সা না থাকার কারণে ওইসব দল থেকে প্রার্থী হওয়ার তেমন কোন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি।সিপিবি থেকে জলি পাল, জাবেদ ভূঁইয়ার নাম শোনা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিপিবি থেকে কেহ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বা দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা নিশ্চিত করে জানা যায়নি।অন্যদিকে ন্যাপ, ওয়ার্কাস পার্টি থেকে যথাক্রমে নিহারেন্দু হোম চৌধুরী সজল ও সৈয়দ আমিরুজ্জামান ও আব্দুল আহাদ মিনার এর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকার কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করা সম্ভাবনাই বেশি।২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ যাবৎ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। গুপ্ত হত্যা, মব জাস্টিস, বিভিন্ন ইস্যু তুলে হানাহানি ও উন্মাদনা, রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কিনা এ নিয়ে অভিজ্ঞ মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে।

You might also like