সংশয় আর বিপদে আকীর্ণ হাসিনার ফেরার পথ
ঢাকার বয়ান বদল,দিল্লির হিসাব-নিকাশ এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ–সব মিলিয়ে হাসিনার পরিণতি এখন আর কেবল এক ব্যক্তির বিষয় নেই।
নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী
ঢাকাঃ তিনি আসবেন,নাকি আসবেন না? বহু মানুষের মনেই এখন এ প্রশ্ন ঘুরছে।শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে সত্যিই ফিরবেন,নাকি ফিরবেন না?আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের মনে এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই।তারা পুরোপুরি আশাবাদী,ডিসেম্বর বা তার আগেই তিনি দেশে ফিরবেন এবং আদালতের মুখোমুখি হবেন।
সরকার অবশ্য তার স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগই দেখছে না।সরকারের মুখপাত্রের ভাষ্যে,হাসিনার সামনে এখন একটাই পথ–প্রত্যর্পণ এবং তারপর ফাঁসি।তবে বাইরে থেকে যারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন,তাদের জন্য সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।কারও কারও ধারণা,হাসিনা হয়ত ফিরতে পারেন,তবে তার আগে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে; যেমন—নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আপিলের অধিকারের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা,ইত্যাদি।আবার কারও কারও মতে,আপিলের সুযোগ না দিয়ে তাৎক্ষণিক ফাঁসির এই হুমকি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্য কোনো আইনি পথ নেই;বরং এটি হাসিনাকে দেশে ফেরার চেষ্টা থেকে বিরত রাখার একটি কৌশল।যদিও স্বয়ং শেখ হাসিনার কাছে গুপ্তহত্যা বা জেলের ভেতরে ফাঁসি কার্যকরের সম্ভাবনাটি খুব একটা অবাস্তব মনে হচ্ছে না।ভারতীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল ‘দ্য ওয়াল’-এর সঙ্গে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,আমি ফিরলে এয়ারপোর্টেও আমাকে হত্যা করতে পারে।
তিনি বলেন,”জঙ্গিবাদীরা কিছু ভাবে না।তারা আমাকে মেরে ফেলতে পারে,বা জেলে দিতে পারে,নির্যাতন করতে পারে বা ফাঁসি দিতে পারে।তারা সেটা করতে পারে।কিন্তু মানুষের কল্যাণ ও স্বার্থের জন্য আমাকে এই ঝুঁকি নিতেই হবে।যারা কষ্ট পাচ্ছে,তাদের পাশে কাউকে না কাউকে তো দাঁড়াতে হবে।এমন একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক,বিশেষ করে এত এত ঝুঁকির কথা যেখানে বলা হচ্ছে।আর বাংলাদেশও তার প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্যভাবে হাসিনার পরিণতির সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে।তবে শুধু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কই এখানে ঝুঁকির মধ্যে নেই।হাসিনাকে নিয়ে কী করা হবে এবং সেই সূত্র ধরে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে,তার সঙ্গে দেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও জড়িয়ে আছে।একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কীভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে,তা নিয়ে একটি সরকার পুরো দেশের ভবিষ্যৎকে বাজি ধরে ফেলবে,তেমনটা অবিশ্বাস্য বলেই মনে হতে পারে।প্রশ্নটা এখন আর ফাঁসি দেওয়া হবে কি না,তা নয়;বরং কীভাবে দেওয়া হবে,তিনি নিজে বিমানে করে দেশে ফিরবেন,নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হাতকড়া পরা অবস্থায় ফিরবেন–এসবই যেন প্রশ্ন।এই অবিশ্বাস্য পরিস্থিতির শুরু হয়েছিল একটি সাক্ষাৎকারে দেওয়া ঘোষণাকে কেন্দ্র করে।
রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে বিতর্কের শুরু
‘তিনি ফিরবেন কি ফিরবেন না’—এই জল্পনার শুরু গত জুলাইয়ে,যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রয়টার্সকে বলেছিলেন,তিনি এবং নির্বাসনে থাকা তার দলের কয়েকজন নেতা ‘ডিসেম্বরের দিকে’বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।অগাস্টে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে তিনি যখন বললেন,তিনি অবশ্যই দেশে ফিরবেন,তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়।অবশ্য তিনি কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেননি।তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেছেন,বাংলাদেশ সরকার কী চায়,‘তার পরোয়া না করেই’ তার মা ফিরতে চান।এফসিসিতে হাসিনার বক্তব্য দেওয়া নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায় বাংলাদেশ সরকার, তাতে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার ঝড় ওঠে।এরপর ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ সরকার তাদের চাওয়া স্পষ্ট করে।বলা হয়, স্বেচ্ছায় ফেরা নয়,হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে হবে।এবং দিল্লিতে অবস্থানকালে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার দেওয়া বন্ধ করতে হবে।সবশেষ দ্য ওয়ালকে হাসিনা সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে।সাংবাদিকদের কাছে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির টানাপড়েনের মধ্যেই প্রথমবারের মত পুরো সাক্ষাৎকারটি অডিও আকারে প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াল।২০২৪ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেকর্ড করা বা সরাসরি সম্প্রচারিত হাসিনার একতরফা বক্তব্যই মানুষ শুনেছে।দ্য ওয়ালের সাক্ষাৎকারই প্রথম, যেখানে পুরো একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব শোনা গেছে।এই সাক্ষাৎকারে হাসিনা আবারও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন।তবে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন,দলের অন্য নেতাদের তার সঙ্গে ফিরতে তিনি ‘নির্দেশ’ দেবেন না,কারণ সবারই বিপদের ঝুঁকি থাকবে।
ইউনূস থেকে তারেক রহমান
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে,সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অবস্থানও বদলেছে।তাতে সরকার সিদ্ধান্তহীনতা বা বিভ্রান্তির মধ্যে আছে বলে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।মুহাম্মদ ইউনূসের সময় হাসিনার ভারতে অবস্থানকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হত।বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ সরব ছিল।তবে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইউনূস খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।হাসিনা ইস্যু মূলত অভ্যন্তরীণ,ভারত-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি কাজে লেগেছিল।
বর্তমান বিএনপি সরকার শুরুটা করেছে ভিন্নভাবে।গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর তাকে প্রত্যর্পণের দাবি নতুন করে সামনে আনার পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে ‘গুরুত্বহীন’ দেখানোর চেষ্টা যুক্ত হয়েছে।কিন্তু শেখ হাসিনা যা কিছুই বলেছেন, সেসব নিয়ে সরকারের প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।সরকার এখন প্রত্যর্পণের দাবির সঙ্গে তার ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ বন্ধ করার দাবিও জুড়ে দিয়েছে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনাও এসব দাবি পূরণের শর্তের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে।হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলে পরিণতি কী হবে, তা নিয়েও সরকার বারবার অবস্থান বদলাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। গত জুলাইয়ে সরকারের মুখপাত্র জাহেদ উর রহমান জোর দিয়ে বলেছিলেন, হাসিনার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং তার আইনি অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে। ৫ অগাস্ট এফসিসির অনুষ্ঠানের আগেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন।
তবে এখন মনে হচ্ছে,হাসিনার ফাঁসিই সরকারের শেষ কথা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামই প্রথম বলেছিলেন যে,হাসিনা দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে,কারণ তার আপিলের অধিকার থাকবে না।তিনি এও বলেন,যে সময়ের মধ্যে হাসিনার আপিল করার সুযোগ ছিল,তা পেরিয়ে গেছে।
অপেক্ষা করছে মৃত্যুদণ্ড
এখন জাহেদও একই সুরে কথা বলছেন।তবে তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ করেছেন। এখন তিনি হাসিনাকে দিল্লি থেকে ‘ধরে আনার’ কথা বলছেন।৮ সেপ্টেম্বর নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জাহেদ বলেন,”শেখ হাসিনা,আপনার আসতে হবে না,আপনাকে আমরা ধরে নিয়ে আসতে চাই।তিনি আসবেন এবং তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।হাসিনা যে আপিলের সুযোগ পাবেন না,তা বোঝাতে তিনি প্রধান প্রসিকিউটরের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।অর্থাৎ, শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটাই যেন বাকি।সংক্ষেপে বললে, হাসিনা নিজের ভাগ্যকে বরণ করে নিতে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলেও সরকারের কাছে তা যথেষ্ট হবে না। তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে আটক অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।আর এই প্রত্যাশা পূরণ হতে হলে ভারত সরকারকে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলতে হবে, কারণ গত দুই বছর ধরে তারা হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়ে আসছে।আপাতদৃষ্টিতে সরকারের এই ‘কঠোর’ অবস্থান একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়: তারেক রহমান সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি হাসিনাকে ফাঁসিতে ঝোলানোই হয়, তাহলে ডিসেম্বরে তার স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই তো তা করা সম্ভব?
তবে যে কারণেই হোক,হাসিনার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সম্ভাবনার বিষয়টি সরকারের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না।তারা বরং তার প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রাখতে চায়,যদিও সরকার এটা ভালোভাবেই জানে যে,ভারত সরকার ওই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে,অথবা আদালতের হাতে দিয়ে বিষয়টি প্রলম্বিত করবে।প্রত্যর্পণের দাবিতে অনড় থাকলে কার্যত এটাই নিশ্চিত হবে যে,অদূর ভবিষ্যতেও শেখ হাসিনাকে ভারতেই থেকে যেতে হবে।
আওয়ামী লীগকে ভয়
শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার হুমকির ব্যাপারেও সরকারকে খুব একটা ‘সিরিয়াস’ মনে হচ্ছে না।এতে একটি উপসংহারেই আসা যায়,সরকারের প্রধান লক্ষ্য হাসিনাকে দূরে রাখা এবং সম্ভব হলে তাকে চুপ রাখা।সেই লক্ষ্য পূরণে সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে,পররাষ্ট্রনীতিতে দিল্লিকে আর অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হচ্ছে না। সরকার সমর্থক মহলে এরই মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে,চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ঢাকাকে সীমান্তজুড়ে থাকা ভারতের বিপুল প্রভাবের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরির মত যথেষ্ট কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের কাছে ঢাকার মরিয়া প্রস্তাবটি সেই আপাত সুবিধার পালে আরও হাওয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি;যদিও সেই সুবিধা এখনও কোনোভাবেই পরীক্ষিত বা প্রমাণিত নয়।বিএনপি সম্ভবত হাসিনা ও ভারত নিয়ে এই কঠোর নীতি থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে তা বিএনপির নির্বাচনি সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়তা করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকেও সন্তুষ্ট রাখা যাবে।জামায়াত-এনসিপি জোটের সাম্প্রতিক ‘লং মার্চ’ এবং অন্যান্য কর্মসূচির লক্ষ্য সম্ভবত বিএনপিকে চাপে রাখা, যাতে তারা আওয়ামী লীগ প্রশ্নে নমনীয় না হয়। হাসিনা যদি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি হিসেবেও ঢাকায় ফেরেন, তাতে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান ঠেকানো কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হয়ে উঠতে পারে।সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম