সিলেটের সাদা পাথর লুটপাট: রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট রোধে দায়বদ্ধতা অপরিহার্য

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর খনি থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনৈতিকতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—যেখানে জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে রাজনৈতিক নেতা—সবারই সরাসরি বা পরোক্ষ যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তরাই যদি লুটপাটের ভাগীদার হন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কোথায় থাকবে?

গত ২১ আগষ্ট ২০২৫ দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো “দুদকের প্রতিবেদন-
পাথর লুটের টাকার ভাগ পেতেন ডিসি–এসপি, জড়িত ৪২ নেতা ও ব্যবসায়ী” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যা’ সমাজ দেশ ও জাতির কাছে উদ্বেগের বিষয়।বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এগুলো দেশের পরিবেশ, পর্যটন, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। কিন্তু প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহার করে কয়েক শ কোটি টাকার সাদাপাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে। এর ফলে পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে, স্থানীয় জনগণ জীবিকা হারিয়েছে, আর রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি প্রক্রিয়া বছরের পর বছর কীভাবে চলল? বিজিবি, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন—সবারই চোখের সামনে পাথর তোলা হয়েছে, অথচ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শুধু নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং কমিশনের বিনিময়ে সক্রিয় সহযোগিতা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটা শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং রাষ্ট্রদ্রোহী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।রাজনৈতিক নেতাদের নামও এই তালিকায় উঠে এসেছে, যা আরও উদ্বেগজনক। কারণ, ক্ষমতাসীন বা বিরোধী—সব পক্ষের নেতারাই যদি লুটপাটে অংশ নেন, তাহলে জনগণ কোন রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভরসা করবে? “সর্বদলীয় ঐকমত্যে লুট”—এ এক ভয়ংকর বাস্তবতা। এতে বোঝা যায়, দুর্নীতি এখন দলীয় পরিচয় পেরিয়ে সর্বজনীন সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর শাস্তি। যারা জড়িত—তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রশাসনিক পদমর্যাদা যাই হোক না কেন—আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু বদলি বা সাময়িক অব্যাহতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ রাষ্ট্রীয় সম্পদে হাত দেওয়ার সাহস না পায়।দুদকের এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু প্রতিবেদন তৈরি করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। আমাদের দেখতে হবে—এ থেকে কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় কি না। জনগণ আর ‘অভিযোগ উঠেছে’ শুনতে চায় না, তারা দেখতে চায় ‘শাস্তি দেওয়া হয়েছে’।রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। প্রশাসনের অঙ্গীকার, রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া সাদাপাথর লুটের মতো ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই এখনই সময়—রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর সর্বজনীন দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

You might also like