স্মরণ:”অতএব দৃঢ় চিত্তে বলি শোন, সূর্য অস্তমিত হয়না কখনো”

 সৈয়দ আনাস পাশা

দুনিয়া কাঁপানো প্রজন্মের একজন ছিলেন তিনি, ছিলেন আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক আইডল। বাঙালীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ত্রাশ। অস্ত্র হাতে রনাঙ্গন চষে বেড়াতেন হানাদার ধ্বংসের প্রত্যয় নিয়ে। ষাটের দশকের শেষ দিকে সিলেটে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উপর জুতা নিক্ষেপ করে সিলেটকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন রাজনীতির ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায়।
শাহ আজিজুর রহমান, সাবেক এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান, আমাদের আজিজ ভাই আর নেই। রবিবার স্থানীয় সময় সকালে ৭৯ বছর বয়সে ত্যাগ করেছেন তিনি এই ধরাধাম।
একই দলের অনুসারী না হলেও তারুণ্যের সেই উত্তাল সময়ে আজিজ ভাইয়ের সাথে আমার যে সম্পর্ক তৈরী হয়েছিলো সেটি কিন্তু ছিলো রাজনীতিকে ঘিরেই। আমার বাবা সৈয়দ আহবাব আলীকে তিনি ‘গুরু’ বলে সম্বোধন করতেন। ছোটবেলায় আব্বার সাথে মাঝে মাঝে যেতাম জিন্দাবাজারের রমনা হোটেলে। দেখতাম তিনিসহ অনেকেই আসতেন আব্বার সাথে আড্ডা দিতে। সেই থেকেই তাকে চিনি।
১৯৮১ সালে এমসি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হলে আজিজ ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী হলেও কলেজে যাওয়া আসার পথে মাঝে মাঝেই ডেকে তুলতেন আম্বর খানায় তাঁর রেষ্টুরেন্ট ‘পিকাডেলী’তে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ ভাই ছিলেন আপাদমস্তক একজন সৎ মানুষ। প্রভাবশালী ছাত্রনেতা, যুবনেতা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি হওয়ার পরও সততায় অবিচল এমন রাজনীতিক আজকের যুগে বিরল প্রজাতীর অংশ। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক কর্মীরা এদের‘বোকা রাজনীতিক’ হিসেবেই চিনে।
৮০র দশকের পুরো সময়টা ছিলাম সিলেটের রাজপথে। স্বৈরাচার বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ছিলাম আজিজ ভাইদের পেছনের কর্মী। বাবার সাথে তাঁর সম্পর্কের সূত্র কখন ঘনিষ্ট থেকে ঘনিষ্ট হয়ে আত্মার আত্মীয়তুল্য হয়ে উঠেছে টেরই পাইনি। আব্বাকে তিনি বলতেন গুরু, রাজনৈতিক শিক্ষক। ১৯৮৩ সালে আব্বার মৃত্যুর পর আজিজ ভাই খুবই শোক কাতর হয়ে উঠেন। মৃত্যুর আগে নাকি জিন্দাবাজার রমনা হোটেলে অবিভক্ত ভারতের ইতিহাস আলোচনার এক পর্যায়ে আলোচনা শেষ না করেই আব্বা উঠে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন ‘পরবর্তী অংশ আগামীতে আলোচনা করবো’। এর পরের সপ্তাহেই আব্বা মারা যান। পরবর্তী অংশ আর শোনা হয়নি আজিজ ভাইয়ের। এই আক্ষেপের কথা দেখা হলেই বলতেন তিনি। লন্ডন থেকে স্বল্প সময়ের জন্য দেশে গেলেও তাঁর সাথে দেখা হতোই। একবার দেশে গিয়ে গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান করছি। কোন এক কাজে কয়েক ঘন্টার জন্য সিলেট শহরে এসেছি আমি ও আমার স্ত্রী। সিলেটে তখন আমাদের ঠিকানা চৌকিদেখী আমার ফুফুর বাসায়। কয়েক ঘন্টার জন্য সিলেট যে এসেছি এটি ফুফুকেও জানতে দেইনি। সিলেট শহরে রিকশায় কখন যে আজিজ ভাই আমাদের দেখে ফেলেছেন তা টের পাইনি। আমাদের খুঁজে সোজা চৌকিদেখীতে গিয়ে হাজির। ফুফুর কাছে জানতে চাইলেন আমরা কোথায়? বললেন আমাদের রিকশায় দেখেছেন। এই খবরে আমাদের প্রতি যে কত অভিমান ফুফুর।
কত যে স্মৃতি আজিজ ভাইকে নিয়ে। ৯৬ সালে ঢাকা বিমান বন্দরে নিহত সুরত মিয়া হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে ঢাকায় গেলে তৎকালীন স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর আমন্ত্রণে সংসদের অধিবেশন দেখতে যাই। দর্শক গ্যালারিতে বসে আছি। হঠাৎ করেই অধিবেশন কক্ষ থেকে ডাক ‘এই আনাস, বাইরে আসো’। দেখি অধিবেশন কক্ষ থেকে ডাকছেন আজিজ ভাই। আশির দশকের মধ্যভাগে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে সিলেটের সুলেমান হলে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় ইংরেজীতে দেয়া আজিজ ভাইয়ের সেই বক্তৃতা এখনও আমার কানে বাজে।
তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক এমন হয়ে উঠেছিলো যে, শেষ পর্যন্ত আত্মীয়তায় আবদ্ধ হই আমরা। তাঁর ছেলে সানি শাহ’র জন্য আমার বোনের মেয়ে সামিয়াকে বউ করে নেবেন এমন আশা নিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন আমার, কখন আমি দেশে যাবো। শেষে এক সময় দেশে গেলে আমার সাথে আলোচনা করেই এই বিয়ে ঠিক করেন।
আজিজ ভাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের উপাখ্যান ছিলো আমার প্রজন্মের এক সময়ের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা জাগানিয়া। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে দুর্দান্ত সাহস ও আপোষহীনতায় সিলেটে এক সময় তাঁর পরিচয় হয়ে উঠে ‘পাগলা আজিজ’ নামে। ষাটের দশকে সিলেটের ছাত্র আন্দোলনের দুর্দান্ত সাহসি ছাত্রনেতা ছিলেন তিনি, ৬৮ সালের শেষের দিকে আইয়ুব খানের উপর জুতা নিক্ষেপ করে পরিচিত হয়ে উঠেন কিংবদন্তী ছাত্রনেতা হিসেবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রজন্মের অনেকেই রাতারাতী আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও আজিজ ভাই রয়ে গেলেন সেই ‘পাগলা আজিজ’। সিগারেট খাওয়ার পয়সাও অনেক সময় তাঁর জুটেনা। এরই মধ্যে ৭৫ এ জাতীর জনকের হত্যাকাণ্ড আবারও তাকে বিদ্রোহী করে তুলে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে যোগ দেন কাদের সিদ্দীকির সাথে।
বাঙালীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট অর্জন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ সৃষ্টির কারিগরদের (মুক্তিযোদ্ধা) একজন শাহ আজিজুর রহমান, এক সময় যার কাছে বসলে আলোচনার সিঁড়ি ধরে নিয়ে যেতেন ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে, স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও কুপমন্ডুকতা বিরোধী সংগ্রামে জনতার কাতারে থেকে রাজপথ মুখরিত থাকতো যার পদভারে, কেন যেন মনে হয় সেই আজিজ ভাই কি এক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন।
সরি আজিজ ভাই, আপনাদের দিয়ে যাওয়া দেশটি আপনাদের মনের মত করে আমরা পুরোপুরি গড়ে তুলতে পারিনি বলেই হয়তো ছিলো আপনার এই অভিমান।ক্ষমা প্রার্থী আপনার কাছে। ভবিষ্যতে কোন এক সময় হয়তো আপনারই তৃতীয় প্রজন্ম জোহানরা (নাতি) এই দেশটি গড়ে তুলবে আপনাদের মনের মত করে। আপনার রেখে যাওয়া আলোর মশাল নিয়ে জোহানরাই একদিন পাড়ি দেবে অন্ধকারের বাকী পথটুকু, যা দেখে অদৃশ্যে থেকেও হয়তো উজ্জল হয়ে ওঠবে আপনার চেহারা।
যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন বাঙালীর হে সূর্য্যসন্তান।
আর শাহ আজিজের সন্তান সানি শাহ ও লিসাকে রবীন্দ্রনাথের ভাষা শোনাতে চাই-
‘অতএব দৃঢ় চিত্তে বলি শোন, সূর্য অস্তমিত হয়না কখনো’।
দু:খ করোনা, শোক থেকে শক্তি সঞ্চয় কর। যে আলোর মশাল রেখে গেছেন তুমাদের বাবা, সেটি নিয়ে দৌড়াতে হবে তুমাদের সন্তানদের। তুমাদের বাবা হারিয়ে গেছেন এমন ভাবনা মনে আসলেই মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির ‘যখন আমার মৃত্যু আসবে’ কবিতাটি পড়ো-

‘যখন আমার কফিন নিয়ে যাবে, তুমি কখনো এটা ভেবোনা-
আমি এ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছি!
চোখ থেকে অশ্রু ফেলোনা, মুষড়ে যেওনা গভীর অবসাদে কিংবা দুঃখে-
আমি পড়ে যাচ্ছি না কোন অন্তর্হীন গভীর ভয়ংকর কুয়ায়!
যখন দেখবে আমার মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে, তুমি কেঁদোনা-
আমি কোথাও যাচ্ছি না, আমি কেবল পৌঁছে যাচ্ছি অনন্ত প্রেমে।
আমাকে যখন কবরে শোয়াবে, বিদায় বলো না-
জেনো, কবর কেবল একটা পর্দা মাত্র, এটা পেরোলেই স্বর্গ।
তুমি কেবল দেখো আমাকে কবরে নামতে
এখন দেখো আমি জেগে উঠছি!
কীভাবে এটার শেষ হয় সেখানে, যখন সূর্য অস্তাচলে যায় কিংবা চাঁদ ডুবে?
এটা মনে হবে এখানেই শেষ,
অথচ এটা অনেকটা সূর্য উঠার মত, এটা বরং সুপ্রভাত।
যখনই কবর ঢেকে দেয়া হবে-
ঠিক তখনই তোমার আত্মা মুক্ত হবে।
তুমি কি কখনো দেখছ একটা বীজ মাটিতে বপিত হয়েছে, কিন্তু নতুনভাবে জন্মায়নি?
তাহলে তুমি কেন সন্দেহ করো- মানুষ নামের একটা বীজ জাগবে না?
তুমি কি কখনো দেখেছো, একটা বালতি কুয়ায় নামানো হয়েছে অথচ এটা খালি ফিরে এসেছে?
তাহলে তুমি কেন আহাজারি করো একটা আত্মার জন্য, যখন এটা কুয়া থেকে উঠে আসে ইউনুসের মত!
যখন তুমি শেষবার নৈঃশব্দে ডুববে, তোমার শব্দ ও আত্মা পৌঁছে যাবে এমন এক পৃথিবীতে
যেখানে কোন স্থান নেই, সময় বলে কিছু নেই!’
(রুমির কবিতার অনুবাদ : রেজা রিফাত)

লেখক: সাংবাদিক, সত্যবাণীর প্রধান সম্পাদক।

You might also like