স্মৃতিচারণ,গরিবের ডাক্তার: মানবতার বাতিঘর ডা. গোলাম জিলানী
সংগ্রাম দত্ত: শ্রীমঙ্গলের মানুষ আজও এক নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে—ডা. গোলাম জিলানী। তিনি শুধু একজন ডাক্তারই ছিলেন না, ছিলেন অসংখ্য গরিব ও অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল। চিকিৎসা সেবাকে পেশা নয়, একেবারে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন এই মহৎপ্রাণ মানুষটি।
শৈশব থেকে চিকিৎসক হয়ে ওঠা:
১৯২৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে জন্ম নেন ডা. জিলানী। পরিবারের আদি নিবাস পশ্চিমবঙ্গ হলেও তাঁর শৈশব কেটেছে বিহারের চক্রধরপুরে। পিতা শেখ স্যায়েদুল ইসলাম ছিলেন ব্যবসায়ী, আর মা লুৎফুন্নেছা ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী।চক্রধরপুরের বিএনআর মিশনারি স্কুলে লেখাপড়ার সূচনা হয় তাঁর। ১৯৪৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে মেধার স্বাক্ষর রাখেন। এরপর ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইসলামিয়া কলেজে এবং ১৯৪৮ সালে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।দেশভাগের অস্থিরতায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে শুরু হওয়া অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ রেখে চলে আসেন পূর্ব পাকিস্তানে। ঢাকায় ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ১৯৫৮ সালে সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন এমবিবিএস ডিগ্রি।
কর্মজীবনের পথচলা:
চিকিৎসা সেবার মহৎ পেশায় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ১৯৬১ সালে। যোগ দেন চা শিল্প শ্রম কল্যাণ বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে। শুরুটা ঢাকায় হলেও পরে নারায়ণগঞ্জে এবং অবশেষে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে বদলি হয়ে চলে আসেন শ্রীমঙ্গল থানা শহরের চা শিল্প কল্যাণ বিভাগে । এখান থেকেই দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টানেন ১৯৮৮ সালে।কিন্তু চাকরি শেষ হলেও শেষ হয়নি চিকিৎসা সেবা। বরং তখনই যেন তাঁর আসল পরিচয় ধরা দেয়—শ্রীমঙ্গলের গণমানুষের ডাক্তার হিসেবে।
গরিবের ডাক্তার—কেন এই নাম?
যে সময়ে ডাক্তার দেখাতে ৫, ১০ বা ২০ টাকা লাগত, সেই সময়ে গরিব রোগীদের কাছে বিনা পয়সায় সেবা দিতেন তিনি। আর যারা সামর্থ্যবান ছিলেন, তাদের কাছ থেকে নেওয়া ভিজিট ফির টাকা দিয়ে কিনে দিতেন দরিদ্র রোগীর জন্য ওষুধ।শুধু চিকিৎসা নয়, অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তিনি। অনেক সময় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দিতেন, কখনো বা অর্থ সহায়তাও করতেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়—“খুব সম্ভবত ১৯৮১ সালের দিকে আমাকেও তিনি একটি ছাত্রসখা নামের বৃত্তি বই কিনে দিয়েছিলেন। ডাক্তার সাহেবের মতো মানুষ আর ক’জন হয়?”
সহজ-সরল জীবনে মানবতার দৃষ্টান্ত:
ডা. জিলানীর জীবনযাপন ছিল একেবারেই সাদামাটা। তিনি চলাফেরা করতেন পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায়। বড় কোনো চাকচিক্য ছিল না। তাঁর কাছে মানুষ গিয়েছে নানা প্রয়োজনে—চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, কিংবা শুধুই মানসিক সান্ত্বনার জন্য। আর তিনি কাউকেই ফিরিয়ে দেননি।শ্রীমঙ্গলের ৮৬ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী বলেন, “ডা. জিলানী ছিলেন আমাদের আপনজন। বিনা পয়সায় চেকআপ করে দিতেন। দরকার হলে নিজের পকেট থেকে গরীব রোগীর ওষুধের টাকা দিতেন। এমন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় না।”
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন-
ডা. জিলানী ছিলেন পাঁচ পুত্র সন্তানের জনক। সন্তানদের মানুষ করেছেন সৎ উপায়ে, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন সমাজে। তাঁর পরিবার আজও গর্বের সাথে বহন করছে এই মহান চিকিৎসকের উত্তরাধিকার।
শেষযাত্রা ও স্মৃতিচারণ-
২০০৭ সালের ১২ মার্চ পরিবার ও প্রিয় শ্রীমঙ্গলবাসীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মৃত্যুর পরেও তাঁর নাম আজও শ্রীমঙ্গলের মানুষ উচ্চারণ করে শ্রদ্ধাভরে। শহরের প্রতিটি মানুষের মনে আছে—সেই ডাক্তার, যিনি চিকিৎসার নাম করে কখনো ব্যবসা করেননি, বরং মানবতার মানদণ্ড হয়ে বেঁচে ছিলেন সবার হৃদয়ে।
আজীবন অনুপ্রেরণা-
ডা. গোলাম জিলানীর জীবন প্রমাণ করে দেয়—চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এটি হতে পারে মানবসেবার মহৎ ব্রত। আজও শ্রীমঙ্গলের মানুষ তাঁকে মনে করে এক নামেই—“গরিবের ডাক্তার”।