হবিগঞ্জ জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম এডভোকেট চৌধুরী আব্দুল হাই
সংগ্রাম দত্ত
সত্যবাণী
হবিগঞ্জ: ভাষা আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধ,গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন এডভোকেট চৌধুরী আব্দুল হাই।ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক,ছাত্রনেতা,আইনজীবী ও সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি হবিগঞ্জ জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম।জীবনের বড় একটি সময় তিনি ব্যয় করেছেন মানুষের অধিকার,গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম করে।১৯৩৯ সালের ৯ মার্চ হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বড় বহুলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।তাঁর বাবা ছিলেন চৌধুরী আব্দুল গণি এবং মা আছিয়া খাতুন চৌধুরী।শিক্ষাজীবনের শুরু বহুলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বৃত্তিসহ তৃতীয় শ্রেণি পাস করেন।পরে হবিগঞ্জ মাধ্যমিক হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে বৃত্তিসহ ষষ্ঠ শ্রেণি উত্তীর্ণ হন। এরপর সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।
১৯৫২ সালে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দেশব্যাপী ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে হবিগঞ্জে আসেন।স্কুলের ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে কোর্ট স্টেশনে বৈঠক করেন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন।আন্দোলনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলে তৎকালীন বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ভিপি ও ছাত্রনেতা সৈয়দ শফিক উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি এবং চৌধুরী আব্দুল হাইকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।এরপর তিনি হবিগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে ছাত্রদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন করেন।তাঁর উদ্যোগে ছাত্রদের ডাকে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হন হবিগঞ্জ মহকুমার সর্বস্তরের মানুষ।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর।১৯৫৪ সালে হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সাধারণ গণিত ও অতিরিক্ত গণিতে লেটার মার্কসহ প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন।১৯৫৬ সালে বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯৫৮ সালে বিএ পাস করেন।পরে ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।১৯৬৩ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ জেলা বারে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন।পরবর্তীতে তিনি হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।পাশাপাশি হবিগঞ্জ জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতিও ছিলেন।রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।পরে ১৯৬৫ সালে ভাসানী ন্যাপের হবিগঞ্জ মহকুমার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৬৭ সালে ন্যাপ (মোজাফফর)–এ যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ মহকুমার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মোজাফফর ন্যাপের সভাপতি হিসেবে হবিগঞ্জ মহকুমা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা এবং গণমানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৮৬ সালের ৭ মে বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আট দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ন্যাপ (মোজাফফর) থেকে হবিগঞ্জ-৩ (হবিগঞ্জ সদর–লাখাই) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ মোক্তালিবকে প্রায় ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন।১৯৯৬ সালে তিনি সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।এরপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নানা কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রাখেন।বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও অংশ নেন এবং হবিগঞ্জবাসীর সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভারত,থাইল্যান্ড,রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাঁর নামে সরকারি গেজেট প্রকাশ করে। এতে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়।২০২৫ সালের ১১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এডভোকেট চৌধুরী আব্দুল হাই। পরে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।ভাষা আন্দোলনের তরুণ সংগঠক থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব এবং জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্ব—দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেম, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করবে।