৫৩ বছরেও অবিচার: গোপালগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞ হত্যার বিচার চাইছেন সন্তান
সংগ্রাম দত্ত
সত্যবাণী
গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জ জেলার টুংগীপাড়া-কোটালীপাড়ার মানুষজন এখনও স্মরণ করেন এক বীর নেতাকে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ যুদ্ধে ছিলেন,কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অন্তত ২০টিরও বেশি সম্মুখ অভিযান পরিচালনা করেছেন।কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ, জননেতা কমরেড হেমায়েত বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যা হন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞ, ওয়ালিউর রহমান লেবু এবং দুই ছাত্রনেতা।কমলেশ বেদজ্ঞ ছিলেন গোপালগঞ্জের হেমায়েত বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী, সাহসী ও জেদী কমলেশ বেদজ্ঞ এক বছর ইন্ডিয়ান নেভিতে চাকরি করার পর দেশে ফিরে বিএসসি শেষ করেন। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন,কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং ন্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষা ও রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।স্বাধীনতার পর, তিনি টুংগীপাড়া-কোটালীপাড়ায় শক্তিশালী বামপন্থী সংগঠন গড়ে তুলেন।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। তবে ভোটের মাত্র তিন দিন পরে, ১০ মার্চ, হেমায়েত বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ড ঘটায়।পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হত্যার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—রাজনৈতিক হিংসা,মুক্তিযুদ্ধকালীন তথ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ,জনগণের সমর্থন এবং ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।কমলেশ বেদজ্ঞের ডায়েরিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ ও সম্পদের তালিকা ছিল,যা হুমকিস্বরূপ বিবেচিত হয়।এছাড়াও, মুক্তিযুদ্ধের পর জনগণ ও সহমুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে হেমায়েতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলে হেমায়েতের মধ্যে হিংসা জন্মায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচারের আশ্বাস দিলেও আট মাসের মধ্যেই হেমায়েতকে ‘বীরবিক্রম’ পদবী দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়।পরবর্তী ৫৩ বছরে ছয়বার হাইকোর্ট মামলা স্থগিত করেছে। ২০১৩ সালে মামলাটি স্পেশাল ট্রাইবুনালে পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হলেও কার্যক্রম স্থির থাকে। ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্ট আসামীর আপিল খারিজ করলেও ন্যায় বিচার আজও নীচু আদালতে পৌঁছায়নি।আজও ২৩ জন আসামীর মধ্যে ২০ জন প্রাকৃতিক মৃত্যু বরণ করেছেন।চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যার ৩ নম্বর আসামীকে নতুন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক করা হয়েছে। অথচ বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের নাম সরকারি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই।”৫৩ বছর হয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে বিচার পাইনি। হয়ত জীবদ্দশায় বিচার দেখতে পারব না,” বলেন কমলেশ বেদজ্ঞের সন্তান। দাদু, ঠাকুমা, মা—সবাই স্বপ্ন দেখেছিলেন ন্যায়বিচার দেখার, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।৫৩ বছরেও অবিচারের আঘাত আজও এই পরিবারের ওপরেই পড়ে আছে।