তুষার আলো

সুশান্ত দাশ

বেলা সান্ধ‍্য। গগণে চাঁদ। সাদা ফকফকা আলো। ভরা আকাশ; যেন চাঁদের দখল। মাঝে মাঝে খ্রিস্টমাস ট্রি। ঝরা পত্রবিহীন লাড়া বৃক্ষ। যেনো দাঁড়ানো নিরব স্বাক্ষী; দেখছে শীতল বাতাসে মিতালী করে তুষার ঝরছে। তুষার আলো,চাঁদের আলোর সঙ্গে,সাঙ্গ শেষে সৌন্দর্য‍্যে বিভোর, শীতল স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে ।

তখন তাপমাত্রা বিয়োগান্তরের দিকে। প্রায় মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সহ‍্যের বাহিরে; চোখ তুষার আলো প্রেমে সিক্ত। রাস্তায় হাঁটতে মনে আঁচ করলাম ইহাই নাকি এখানকার শীতকালের রূপ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক ভিন্ন শোভা। যত দূর চোখ যায় শুধু সাদা সাদা তুষার। যে দিকে তাকাই মাঠ-ঘাট,পাহাড়, দিগন্তজোড়ে ঢেকে পড়েছে শ্বেত শুভ্র তুষার। পাতাবিহীন কৃষ্ণকালো গাছের ডালে ঝুলে আছে তুষার,লেগে আছে তুষারের শুভ্রতা। সাদা তুষারের সাজে গাছগুলো যেন আনন্দে মেতে উঠছে। শুভ্র তুষারের শাড়ি পড়ে,অপরূপ সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় শুভ্র তুষার আলো ছড়াচ্ছে। কৃষ্ণকালো গাছের ডালের কিয়দংশ, পিচ ঢালা রাস্তার গাড়ি চলাচলের মাঝের কালো অংশ, রাস্তার এক লাইট পোস্ট হতে অন‍্য লাইট পোস্টের আলোহীন মধ‍্যবর্তী কালো অংশ ব‍্যতীত সাদা আর সাদা চোখে লাগছে। যেনো শ্বেত শুভ্র শোভার, তুষার আলো। কানে বাজছে নীল আর্মস্ট্রং, এডউয়িন অলড্রিন,মাইকেল কলিন্স সহযাত্রী হতে ডাকছে।
শৈশবে দেখা বিটিভিতে হুয়াইট টুথপেস্টের‘সাদা সাদা; আরো সাদা’ বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। শীতের দাপটে বন্ধ চঞ্চু। গোল্ডলিফ বা বেনসন সিগারেট নয়, নয় পাতার নাসির বিড়ি, বুঝছি; হুক্কার তামাক-টিক্কার ধোঁয়া নাক দিয়ে উড়ছে। আর কে যেন বলছে, হুক্কার শব্দে-ছন্দে সত‍্যজিৎক রায়কে শোনিয়ে শোনিয়ে তারেক মাসুদ লিখছে “ রাধা যেমন সাদা সখি কৃষ্ণ তেমন কালো/ আহরে দুজনারই প্রেম মিলে সইলো জগত হইলো আলো’’।

বলছিলাম তুষার আলোর কথা। প্রকৃত পক্ষে তুষারে কোন আলো নেই বা থাকার কথাও নয়। তবে দিনের সূর্য, রাতের চন্দ্র কিংবা রাস্তার দুপাশে বৈদ‍্যুতিক বাতি বা গাড়ি চলাচলে যে আলো তুষারে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে সেই তুষার আলো।

শীতের প্রত‍্যুষে চোখ খোললে বোঝি তুষার আলোর শুভ্রতায় ধাঁধা লাগছে চোখে। আঁকড়ে ধরেছে সেন্ট ক‍্যালিক্সট্ কে। সেন্ট ক‍্যালিক্সট্ ,কানাডার নিরব নিস্তব্ধ এক জনপদ। অন্যতম প্রাচীন শহর মন্ট্রিয়ল হতে বেশ দূরে। নিজস্ব গাড়িতে আসলেও প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগে। এখানে স্থানীয়দের কাছে ফ্রেন্সভাষা প্রচলিত। ফ্রেন্সভাষার কারণে ‘সেন্ট ক‍্যালিক্সট’ সেন্ট ক্যালিক্স হিসেব পরিচিত ।
ইতিহাস বলছে বর্তমানের সেন্ট-ক্যালিক্সট মূলত আইরিশ বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল এবং কিলকেন্নি টাউনশিপ নামটি বহন করেছিল। তারপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্বের দেশগুলি থেকে অভিবাসীদের একটি বড় আগমন,পৌরসভার বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। দেখাযায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকের বসবাস। এলাকাটি গাছ গাছরায় ঢাকা উঁচু নিচু। লতানো গাছের ন‍্যায় তার রাস্তা ঘাট। ছোট ছোট জলাশয়,হ্রদ,ঝর্ণা পাহাড়ি এলাকা হিসেবে চোখে লাগছে। আর ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা কৃষিভূমির মতো দেখা যাচ্ছে।

প্রথম তুষার পরার দৃশ‍্য গ্রীষ্মের মেঘহীন রৌদ্রজ্জল হাওরের আকাশে চাঁদের বুড়ির সুতার মতো মনেহচ্ছিল। বিলাত জীবনেও এমন দৃশ‍্য দেখেছি। দেখেছি মন্ট্রিয়ল,নিউইয়র্ক,সেন্ট ক‍্যালিক্সট্ র মতো জায়গাতেও। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪; নিউইয়র্ক ঘুরে মন্ট্রিয়লে ফিরেছিলাম। ফ্লাইট ছিল নিউইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে কানাডার মন্ট্রিয়ল- পিয়‍্যরী ইলিয়োট ট্রুডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এর ক’দিন আগ হতে নিউইয়র্কেও তুষারপাত হয়েছিল। বিমানটি আকাশ উড্ডয়ন শেষ করে, মন্ট্রিয়লে নামতে গিয়ে নিচের দিকে চোখ রাখতে দেখি, নিউইয়র্ক বিমানবন্দর যে অবস্থায় দেখে আসছিলাম এখানে সেই অবস্থায়ও চেনার কোন খোদরত নেই। বাহির হলে একমাত্র রাস্তায় চলন্ত গাড়ি ও তার পথ দেখার লাইট ছাড়া বাদবাকী সব তুষারে ঢাকা। ফুটপাত,কালবার্ট,ব্রীজ,গাছ-গাছালি তুষারে একাকার। শুধু শ্বেত শুভ্র তুষার আলো। সাদা আর সাদা। দূর হতে মনেহয় যেন চাঁদের মাটিতে অবতরণ।
উল্লেখ করতে হয়ে ফ্লাইট নির্দিষ্ট সময়ে চললেও পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘন্টা লেইট। অতি তুষারপাতের কারণে; যেখান হতে পাইলট বিমান উড়াবে সেখানে ২৩তম বিমান( বিমান বালার ভাষ‍্য মতে) হিসেবে ট্রাফিক জ‍্যামে আটকা। জানালা দিয়ে বাহিরে চোখ রাখতে চোখে লাগলো বিমান উড়ার ঢালাই-রাস্তা আর পাশের দ্বৈত‍্যকার জলাশয়, তুষারে একাকার।

তুষার দেখতে কোন কোন সময় চাঁদের বুড়ির সুতার ন‍্যায়, তুলার মতো পড়ে। অনেক সময় আবার আস্তে আস্তে বেড়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির ন‍্যায় অবিশ্রাম ধারায় পড়া শুরু করে। মাঝে মাঝে ক্ষনিকের বিরতি হলেও বাস্তবতায় মনেহয় রবি ঠাকুরের “আষাঢ়“ কবিতাকেও তুড়ি মারবে। কানাডাতে এমনই রেকর্ড চোখে পড়ে ২০০৫ সালের বিরামহীন ভাবে এগারো ঘন্টায় ৪২ সেন্টিমিটার। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের ২৪ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার । ১৯৭১ সালে ৪৩ দশমিক ২ সেন্টিমিটার।

তাপমাত্রা যখন শীতল থেকে শীতলতার দিতে ধাবিত হয় তখন তুলার মতো তুষার জমে বরফে হওে ওঠে। অতঃপর পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। তুষারপাত বন্ধ হলে রাস্তায় বিরাট আকারের লরি(গাড়ি) নামে। রাস্তা থেকে বরফ তুলে গলানো হয় নির্দিষ্ট স্থানে। গলানোর সময় সকল নুড়ি পাথর আটকিয়ে দেয়া হয় ছাকনিতে।
সেই নুড়ি আবারো ব্যবহৃত হয় রাস্তায়, যাতায়াতের সুবিধার্থে। আর ঐ পানি চলে যেতে চায় নিম্নভূমি,জলাশয়,নদী কিংবা সাগরে। কিন্তু যেতে চাইলেই কি আর যেতে পারে ? অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার পরিণত হয় কঠিন বরফে।

কয়েক যুগের অধিবাসী লেখক-গবেষক তাজুল মোহাম্মদ ‘র লেখা হতে জানা যায় ‘ ডিসেম্বর মাস থেকেই চলে এ ধারা। কখনো কখনো আগে আগেই নামে তুষার। নভেম্বরে এমন কি কোনো কোনো অক্টোবরেও তুষার পড়ার নজির রয়েছে। আর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ মাসে তো ঝরে অঝোর ধারায়। কোনো কোনো বছর এপ্রিল-মে মাসেও কমবেশি পড়ে থাকে তুষার’।

দেখাযায় কানাডায় স্থানীয় সরকারের মোটা অংকের বাজেট ব‍্যয় ধরা হয় বরফ সরানোর কাজে। যখন একটানা দিনের পর দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা তুষার পরে বরফের স্তূপ জমে, সরানোর জন‍্যে তখন ছোট ছোট এক ধরনের গাড়ি ব্যস্ত হয়ে উঠে,পায়ে চলা পথ বা ফুটপাতে। পথচারীরা যাহাতে পা পিছলে না পড়ে,সেজন‍্য নুড়ি পাথর দেওয়া হয় ছিটিয়ে। সাধারণত এসব কাজ হয় রাতের বেলা। পথচারীদের কম পদচারনার সময়। নোটিশ টাঙানো হয় রাস্তায়। যেসব রাস্তায় তুষার বা স্নো সরানো হবে, লাল নোটিশ সম্বলিত নোটিশ লাগানো হয় দিনের বেলায়। উল্লেখ থাকে সময়সীমা। সাধারণত সে সময়সীমা হয়ে থাকে সন্ধে সাতটা থেকে সকাল সাতটা। বরফ সরানোর কাজ শুরু করার আগে সেখানে কোনো গাড়ি পার্কিং করা থাকলে তা সরানোর জন্যে সাইরেন বাজানো হয়। তাও যদি কেউ শুনতে না পায় এবং নিজের গাড়ি না সরায়, তাহলে আসবে টোয়িং বিভাগের গাড়ি। টেনে নিয়ে যাবে ঐ গাড়িগুলো। নিরাপদ স্থান কাছাকাছি যেখানে পাবে, সেখানেই রেখে দিবে গাড়িগুলো। আর উইন্ডশিল্ডের নিচে আটকে রেখে যাবে এক একটি টিকেট।

শীত মানেই তুষারপাত। মনেহয় মেরু অঞ্চলের দেশ কানাডার জন‍্য একেবারেই অত‍্যুক্তি হবে না। ব্রিটেনে কোন খ্রিস্টমাস সময়ে যদি তুষারপাত নাও হয়, বিজনেস স্বার্থে বিজ্ঞাপনের মতো,বিক্রয়পণ‍্য কৃত্রিম-খ্রিস্টমাস গাছগুলোতে হলেও হালকা তুষারপাতের প্রলেপ দেখানো হয়। কানাডাতে বোঝলাম তুষারপাতের ফলে পিচ্ছিল রাস্তায় দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে প্রত‍্যেকের প্রতিটি গাড়ির টায়ার বদলাতে হয়। শীতের প্রাদুর্ভাব আসলে সকল গাড়ির মালিককে নোটিশ দিয়ে জানানো হয়। জানা যায় তুষারপাতকালীন সময়ে টায়ার না বদলালে সরকারি জরিমানা গুনতে হয়। গাড়িগুলোকে তুষারপাত হতে রক্ষার জন‍্য নির্দিষ্ট গ‍্যারেজ ছাড়াও ‘ট‍্যাম্পু’ নামক অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয় (ভাটির হাওরে ধান মারাইয়ের ত্রিপাল বা লবনের বস্তার মতো শক্ত পলিথিন দিয়ে তৈরি তুষারপাত হতে রক্ষার জন‍্য গাড়ি রাখার অস্থায়ী ঘর)। আর তুষারাচ্ছন্ন পিচ্ছিল রাস্তায় দুর্ঘটনা এড়াতে পায়ে হেঁটে চলার জন‍্য স্নোয়িং বুট পড়তে হয়। এতোকিছুর পরও প্রযুক্তির কল‍্যাণে চলতে থাকে স্বাভাবিক জনজীবন।

মনেহয় তুষার আলোর যাদু আছে। শীতল বাতাস,অমানিশি রাত,পূর্ণিমা চাঁদ,লাইট পোস্টের আলো কিংবা খ্রিস্টমাসের সাজানো আলোকসজ্জা’র সঙ্গে, সাঙ্গ শেষে সৌন্দর্য‍্যে বিভোর, তুষার আলো শীতল স্নিগ্ধতা ছড়ায়। অকৃত্রিম মুগ্ধতায় ভরে দেয় মন। সে কারণেই তুমুল ঠান্ডা ভুলে চোখের নজর চলে জানালার বাইরে। সুযোগ বোঝে চায় রাস্তায় নামতে। উঠে কতোক ছবি, উঠে সেলফি; ভরে তোলে ছবির বাহার সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাইতো কবিদের কবিতা, ভাবুকের গল্পে তোষার আলো উঁকি মারে।

লেখক: সদস‍্য, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব, যুক্তরাজ্য।
sushantadas62@yahoo.co.uk

You might also like