গৃহকোণে একুশের দীপশিখা, প্রজন্মে প্রজন্মে চেতনার অঙ্গীকার

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
সত‍্যবাণী

লন্ডন: ট্রিও আর্টসের নিবেদনে, নৃত্যশিল্পী রুবাইয়াত শারমিন ঝরা’র স্নিগ্ধ উদ্যোগে রেডব্রিজের এক গৃহকোণে জেগে উঠেছিল এক টুকরো একুশের প্রাঙ্গণ।

রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেডব্রিজের সেই ঘরোয়া আয়োজনে দেয়ালজুড়ে ছিল ভাষার আবেগ, আর বাতাসে ভাসছিল স্মৃতির নীরব দীপ্তি।

গান আর কথামালার ফাঁকে একুশের অমর চেতনাকে স্মরণ করলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান। তাঁর কণ্ঠে ফিরে এলো ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিন, মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা প্রভাত—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অর্পিত হলো ইতিহাসের আগুনে দীপশিখা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা  হাসান যেন স্মৃতির প্রদীপ হাতে সবাইকে ফিরিয়ে নিলেন ষাটের দশকের সেই উত্তাল প্রভাতে—যখন অমর একুশের প্রভাতফেরি ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, ছিল প্রতিবাদের শপথ, অঙ্গীকারের অগ্নিসাক্ষী। ভোরের শিশিরভেজা পথে খালি পায়ে এগিয়ে যাওয়া তরুণদের কণ্ঠে উচ্চারিত হতো শহীদের নাম; কালো ব্যাজ, হাতে লেখা ব্যানার আর বুকভরা ব্যথা—সব মিলিয়ে এক অদম্য জাগরণের আবহ।

তিনি বর্ণনা করেন, প্রভাতফেরির পূর্বপ্রস্তুতির কথা—রাতভর পোস্টার লেখা, স্লোগান তৈরির গোপন বৈঠক, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের নিভৃত আয়োজন। ভাষা আন্দোলনের সেই দীপ্ত শিখা কীভাবে ক্রমে স্বাধীনতার দাবানলে রূপ নেয়, তারই জীবন্ত সাক্ষ্য ছিলেন তিনি। তাঁর কথায় উঠে আসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য আগমন।

তিনি স্মরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ—যা ছিল একটি জাতির মুক্তির মহামন্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ডামি রাইফেল হাতে তরুণদের প্রস্তুতি, গোপন ট্রেনিং, অজানা ভবিষ্যতের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুর্বার সাহস—সব মিলিয়ে এক রুদ্ধশ্বাস সময়ের কথা তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান।

অনুষ্ঠানের এক আবেগঘন মুহূর্তে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান ট্রিওআর্টস-এর কর্ণধার রুবায়েত শারমীন ঝরার হাতে তুলে দেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত বিজয়ের চল্লিশ বছর পূর্তির স্মারক নোট—যেন ইতিহাসের প্রতি সম্মান, সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রজন্মান্তরের হাতে তুলে দেওয়া এক গৌরবময় উত্তরাধিকার।

এই একুশ আড্ডায় কবিতার মায়াবী আবহ যোগ করেন সংস্কৃতিকর্মী উর্মী মাজহার। তাঁর আবৃত্তিতে শব্দগুলো যেন শহীদ মিনারের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দাঁড়ায়—শ্রদ্ধায়, শোকে, গৌরবে।

সঙ্গীত পরিবেশনে ছিলেন,  মেহবুবা লিথি, সায়েলা শারমিন, কাজি ফারহানা আক্তার, বাদল রহমান ও নিনি রহমান। নৃত‍্যে ছিলেন, দেবিনা রায়, আবৃত্তিতে বাদল রহমান ও রুবাইয়াত শারমিন ঝরা।

অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন, মিসবাহ শহিদ, মাসুদ জামান, বাদল রহমান, অপু চৌধুরী ও আয়হাম শহীদ।

একুশ আড্ডায় অতিথিদের মধ‍্যে উপস্থিত ছিলেন, সাপ্তাহিক সত্যবাণী’র সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা, বার্তা সম্পাদক নিলুফা ইয়াসমিন হাসান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বার্কিংসাইড ওয়ার্ডে লেবার দলের প্রার্থী সৈয়দা পাশা, সংস্কৃতিকর্মী শাহাব আহমেদ বাচ্চু এবং  আব্দুল আজিজ।

আড্ডা আলোচনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, একুশের চেতনাকে অসম্মান করতে পরিকল্পিতভাবে ‘আজাদী’, ‘ইনসাফ’, ‘ইনকিলাব’ প্রভৃতি শব্দ আমদানির অপচেষ্টা চলছে—যা ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাঙালির আত্মপরিচয়কে বিভ্রান্ত করার শামিল। তাঁরা সতর্ক করে দেন, নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসবিমুখ করার এমন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিবার ও সমাজকে সজাগ থাকতে হবে।

বক্তাদের ভাষায়, “একুশ মানে বাংলা ভাষার অধিকার, বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার ঘোষণা। এই চেতনাকে ভিন্ন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অভিধায় আড়াল করার যে কোনো প্রয়াসই আমাদের ইতিহাসের প্রতি অবিচার।”

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কমিউনিটির বিশিষ্টজনেরা। গৃহের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ না থেকে আয়োজনটি হয়ে ওঠে প্রবাসে ভাষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনের এক অনন্য মিলনমেলা—যেখানে আবেগ, ইতিহাস ও দায়িত্ববোধ এক সুতোয় গাঁথা হয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিল একুশের অমর অঙ্গীকার।

অনুষ্ঠান শেষে একুশ আড্ডায় উপস্থিত সকলকে ইফতার ভোজে আপ‍্যায়িত করেন ঝরা দম্পতি।

You might also like