মাতাল বাঁশি

 হামিদ মোহাম্মদ

(সাহিত্যের বহু শাখায় বিচরণ হামিদ মোহাম্মদ-এর। কবিতা,গল্প, উপন্যাস এমনকি মননশীল সাহিত্য কোনটাই বাদ যায়নি। লিখেন সমান সৃজনশীলতা নিয়ে, সমান উজ্জ্বলতায়। সত্যবাণী প্রতি রোববার ধারাবাহিক প্রকাশ করবে তাঁর লেখা উপন্যাস ‘মাতাল বাঁশি’। সাম্প্রতিক নানা বিষয় থেকে শুরু করে ধর্মীয় মৌলবাদী উত্থান, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক  আন্দোলন, চিকিৎসাবাণিজ্য, বাঙালি, বাংলাদেশ এবং বিলেতের অভিবাসী প্রেক্ষিত—সব একসুত্রে গেঁথেছেন লেখক। পাঠক পড়তে থাকুন,আমরা আছি আপনাদের সঙ্গে।)

॥তেরো॥

নিয়মিত হাসপাতালে আমার উপস্থিতি দেখে এলাকার মানুষজন খুশিই হয়। প্রথম যারা সন্দেহ করেছিল, আমার উপস্থিতি নিয়ে যে তিনি কতদিন আর থাকবেন, বিলেত থেকে এসে কতটুকু আর খাপ খাওয়াতে পারবেন, একদিন ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে দৌঁড় দেবেন হয়ত বিলেত, সেই আমি এখন সকলের ডাক্তার আপা। আমার নাম ডা. মাধুরী আজাদ বুঝা যায় মিলিয়ে বা তলিয়ে গেছে ডাক্তার আপার আড়ালে পড়ে। আমিও হাসিমুখে এলাকার অতি সাধারণ মানুষদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে প্রথমত শিশুকাল আমার বাংলাদেশে। তারপর মা-বাবা দু’জনই সাংস্কৃতিক ঘরানার মানুষ। রক্তে আমার গ্রাম, সবুজ ঢেউ খেলানো বাংলাদেশ এবং হাড় জিরজিরে মানুষদের দেখে দেখে বড় হওয়া। কাঁচা ছনবেতের ঘরবাড়ির বাড়তি কোন গল্প নেই–এ রকম পরিবেশ আমার জন্য অবাক কিছু নয়। যদিও সিলেট শহরের টিনের বাংলো তথা আসাম প্যাটার্ন বাড়িগুলোর মধ্যে আমাদেরও একটি বাড়ি আছে, যেখানে আমার বড় হওয়া। আমাদের গ্রাম ঢালার চরের বাড়িতেও দুই সারি বাংলো প্যাটার্নের ঘর রয়েছে। শুনেছি, গ্রামের বাড়ি এবং  দাদার নানান রকম গল্প। দাদা ছিলেন সৌখিন লোক। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদী চেলাগাঙের ঘাটে বাঁধা থাকতো রঙিন পানসী নাও। পানসী নাও খুব একটা চড়া না হলেও, ঘাটে পানসী নাও বাঁধা থাকতে হবে। আর ছিল আটচালা বাংলোঘর। ছনের ঘরটির অদ্ভুত ঢৌল দেখে মানুষ আপ্লুত হত। দাদাকে আমি দেখেছি, আমার সাত বছর বয়সে তিনি মারা যান। তখন বাংলো ঘরটি ছিল, পানসী নাও ছিল না। তিনি বটনি হুকো সাজিয়ে লম্বা নল দিয়ে তামাক টানতেন বাংলাঘরের বারান্দায় বসে। লোকজনের ভিড় লেগেই থাকতো বাংলো ঘরে, চলতো পয়-পঞ্চায়েতি আলাপ-আলোচনা। যদিও ছোট বয়সে এসবের কিছুই মাথা-মুণ্ডোত ঢুকতো না আমার। মূলত আমরা বাড়িতে গেলে বাড়ির আম-জাম বরই গাছের ডালে ডালেই ঘুরতাম। একদিন বা দু’দিনেই ফিরতাম শহরে, পরের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছুট দিতাম স্কুলে। তারপর ভুলে যেতাম। এই ছিল গ্রামে থাকা বা গ্রামকে ভালবাসা।

এই দৌঁড়ঝাঁপের মাঝে বাংলাদেশকে যতটুকু চিনেছি, তা কম নয়। ডাক্তার হিসেবে দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াতে সেবার মনোভাব শুধু নয়, দায়িত্ববোধই কাজ করছে। আমার মূল চেতনা চিকিৎসার বাণিজ্যকরণ রোধ। টাকা  ফানুসের মত না উড়িয়ে চিকিৎসা বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, এটাই আমাকে ব্যথিত করেছে বেশি।  এই টাকা উপার্জনের বিপরীতে আমার এক টাকার হাসপাতাল। অল্পদিনেই আমাকে দিয়ে  মানুষের সামান্য বিশ্বাস জন্মেছে, এটাই আমার প্রথম সান্তনা। এই সান্তনা শুধু আমার নয়, আমার পিতা-মাতা, স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদেরও।

দূর থেকে আমাকে দেখিয়ে অনেকে বলে ঐ উনি ‘এক টাকার ডাক্তার’। জানা মতে, বিশেষ অর্থে এটাও আমার নাম এখন। আমি জানি, এ নামে আমাকে ডাকা হয়, তবে সামনাসামনি কেউ বলে না, এটা আমার বিশেষ পরিচয় মাত্র। এক অর্থে আমি আনন্দবোধ করি এই জন্য যে, বাংলাদেশে যেখানে টাকার ঝড়ি ছুটে চিকিৎসায়, সেখানে গরীবদের চিকিৎসাক্ষেত্রে সামান্য অবদান রাখার জন্য যদি তুচ্ছ হলেও একটি নাম গ্রামেগঞ্জে মুখে মুখে ঘুরে তাতে ক্ষতি কী। এটাও আমার একটা তৃপ্তি, আনন্দও বটে। সম্ভবত এ বোধজ্ঞানটিও অর্জন করেছি মা-বাবার সাথে সাংস্কৃতিক বলয়ে ঘুরাঘুরি করে। অসাধারণ কিছু অর্জন না করলেও সামান্য  কিছু শিখেছি নানান স্তরের মানুষকে দেখে  দেখে।

হাসপাতালে আমি পাঁচ মাস অতিক্রম করেছি এক অভাবনীয় ঝড়-ঝাঁপটার মধ্য দিয়ে। একটা প্রতিষ্ঠান গড়তে কত ঝড় বা বাঁধা পেরুতে হয়, তা হিসেব  কেউ করে না বা নেয় না। আমিও মেনে নিয়েছি কাজের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে অনেক কিছু। এরপর নিজের প্রতিষ্ঠান নিজের হাতেই গড়তে হবে, এ শিক্ষাও পেয়েছি পিতা-মাতা এমনকি শিক্ষকদের নিকট থেকে। তাই, হাল ধরার শক্তি আগেই অর্জন করে নেমেছি আমি। বাবারও ভরসা ছিল এক্ষেত্রে, তার মেয়ে আমি সংগ্রাম করতে জানি। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি অল্পদিন পরেই চলে যান বিলেত। আমারও চোখ-কান-নাক তত দিনে ফুটেছে অর্থাৎ বলা যায় আমিও রপ্ত করেছি কাজ ও এলাকার মানুষদেরকে।

‘এক টাকার হাসপাতাল’কে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে আরও কিছু পদক্ষেপ নিই, যে কাজের মধ্য দিয়ে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। রোটারেক্ট ক্লাব ও লায়ন্স ক্লাবকে দিয়ে ফ্রি আই ক্যাম্প বৎসরে দু’দিন আয়োজনের ব্যবস্থা করি। হাসপাতালের মাঠে ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ এবং ২২ তারিখ এ আয়োজন একটি মাইলফলক হয়ে এলাকার মানুষের মাঝে বিশ্বাস অর্জন করে। নির্ভরযোগ্য একটি ব্যবস্থা হিসেবেও আমাকে মানুষ সমীহ করতে শুরু করে। আমার এ উদ্যোগকে মা-বাবাও পছন্দ করেন, আমাকে উৎসাহ দিয়ে মানুষের সাথে ভালবাসা অটুট রাখার পরামর্শ দেন।

এই ক্যাম্পগুলোর ব্যয়ভার বহন করেন সংশ্লিষ্ট ক্লাব। ক্যাটারেক্স নির্ণয় ও অপারেশন, নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা চশমাদানসহ সাধ্যমত চিকিৎসা তারা করেন। ঔষধও বিনামূল্যে প্রদান করেন ক্লাবের মাধ্যমে। আমি শুধু তদারকি করে ক্ষান্ত হই না,যতটুকু সম্ভব সেবাদান অব্যাহত রাখতে পিছ-পা হই না। জটিল রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পাঠিয়ে দিই। সহযোগিতার হাত বাড়াই যে কোন মূল্যে। একজন মানুষকে সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখানোর ব্যবস্থা করা বা অব্যাহত রাখার আনন্দে নিজেও সুখ পাই, তৃপ্তি পাই,স্বার্থকতা উপলব্ধি বা মনের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। এটাই আমার জীবনে অপরূপ একটি মাতাল বাঁশি (চলবে)

You might also like