পথের গল্প

 রেনু লুৎফা

কোর্টে পৌঁছে নথিপত্র পড়ে দেখি এক পক্ষ আমার পরিচিত। সাধারন পরিচিত নয়। বেশ জানা শুনা মানুষ। তার পরিবারের সাথেও রয়েছে জানাশুনা। তার এক ভাই আমাদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে। বেশ চিন্তা ভাবনা করে, চেয়ারে বসতে পারবো না বলে কর্তৃপক্ষ কে জানতে দিলাম।
কোর্টে বসে নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করতে না পারলে কর্তৃপক্ষ কে বলতে হয় যে “আমি নিরপেক্ষ থাকতে পারবো না বলে সন্দেহ হচ্ছে”। এমনিতে নিরপেক্ষ থাকতে আমার কোন অসুবিধা হয় না। জানাশুনা বা বন্ধুদের মাঝেও আমি নিরপেক্ষ থাকতে পারি। এতে করে বন্ধুদের তালিকাটি ক্রমশ ছোট হতে থাকলেও আমার কোন খেদ নেই। আমি আমাতেই তৃপ্ত।
তারিখ না বদলিয়ে অন্য কোর্ট রুম থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ধার করে পাওয়া গেল। এর পূর্বে এরকম কখনো ঘটে নি। ইনার সিটির কোর্ট, এরকম হওয়া অসম্ভব না হলেও কখনো ঘটেনি। তবে কখনো যে ঘটবে না তা নিশ্চিত ছিলাম না। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। চেয়ারে বসেন ৩জন ম্যাজিস্ট্রেট। একজন আইন পড়া পেশাধার ম্যাজিস্ট্রেট, অন্য দু’জন কমিউনিটির সাধারণ মানুষ, তাদের বলা হয় lay ম্যাজিস্ট্রেট। এই লে ম্যাজিস্ট্রেট তৈরী করতে প্রায় দু’বছর সময় লাগে। কিছু পড়াশুনা,পরীক্ষা,নিরীক্ষা সহ প্রচুর অভিজ্ঞতা লাগে। নানা রকমের ট্রেনিং নিতে হয়। এই সব লোহা পেটানো ট্রেনিংয়ের পরে
আমি তখন ওইরকম এক লে ম্যাজিস্ট্রেট। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। ছোট ছোট অপরাধের বিচার হয়। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এর সর্বোচ্চ ৫ হাজার পাউন্ড জরিমানা করার ক্ষমতা ছিল।
নিরপেক্ষ থাকার বিষয়ে বেশ কয়েকটি ট্রেনিং করেছি। এমন কি কুরআন হাতে নিয়েও নিয়োগের সময় নিরপেক্ষ থাকার শপথও নিয়েছি।
কোর্টের বিচার ব্যাবস্থা বা কেইস নিয়ে আলোচনা নয়। আমি কেন নিরপেক্ষ থাকতে পারবো না বলে বলেছিলাম তাই আমার আলাপের বিষয়।
লোকটি একবার তার মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। ফেরার সময় তার গাড়ি খানা বিগড়ে গেল। কোনমতেই স্টার্ট হচ্ছে না। জানতে চাইলেন আশে পাশে কোন গ্যারেজ আছে কি না। আমি আমাদের জানাশুনা গ্যারেজের ঠিকানা দিলাম। দীর্ঘ সময় ধরেই আমরা আমাদের গাড়িগুলো তাদের ওখানেই সার্ভিস করাই। তাদের কে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে ঐ লোক্টকে কথা বলতে দিলাম। তিনি তার গাড়ির সমস্যার কথা বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যারেজ থেকে একজন ম্যাকানিক চলে আসলেন। অনেক চেষ্টা তদবির করার পরেও
গাড়িখানা স্টার্টস দিতে পারলেন না। ম্যাকানিক জানালেন গাড়ীর জন্য নতুন একটা পার্টস লাগবে। লোক্টি নতুন পার্টস নিতে রাজি হলেন। তার গাড়ি ঠিক হলো। কিন্তু বিল দিতে গিয়ে বললেন তার সাথে পর্যাপ্ত টাকা বা কোন ক্রেডিট কার্ড নেই। অগত্যা আমাকেই বিলটি পরিশোধ করতে হলো। আড়াইশ পাঊন্ডের বিল। কথা ছিল পরের দিনই তা ফেরত দিতে আসবেন। তারপর প্রায় দু’বছর তার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। তিনি টাকা ফেরত দেবার বা দিতে না পারার কোন কৈফিয়ত দিতেও আমার সাথে আর যোগাযোগ করেন নি। আমিও ঠকে যাওয়ার লজ্জায় তার সাথে কোন যোগাযোগ করিনি।
হঠাৎ একদিন বেশ রাত করে তিনি আমাকে ফোন করলেন। সচরাচর আমি রাত ১০টার পর কোন ফোন ধরি না। কিন্তু বার বার ফোন করা হচ্ছে বলে ফোন ধরতে বাধ্য হলাম।
ফোন ধরেই বললেন তিনি আগামীকাল হজ্বে যাচ্ছেন, ফিরে এসে টাকাটি শোধ করে দিবেন। ঠিক আছে বলে ফোন রাখলাম।
কিন্তু টাকাগুলো তিনি ফেরত দেন নি বা দিতে পারবেন না বলেও আমার সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি। তার সাথে এই ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার জন্যই আমি নিরপেক্ষ থাকতে পারবো না বলে সন্দেহ করেছিলাম। ইচ্ছে করেই তার পক্ষে বা বিপক্ষে কোন অবস্থান নেই নি।
তারপর প্রায় ১৫ বছর কেটে গেলেও আমি আমার পাওনা টাকাগুলোর কথা ভুলে যাইনি।
হঠাৎ করে এই করোনা কালে তিনি আমায় ফোন করলেন। ভাল মন্দ জিজ্ঞেস করার পর জানতে চাইলেন, তিনি আমার টাকাগুলো ফেরত দিয়েছিলেন কি? তার এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম কোন টাকার কথা বলছেন আপনি? তিনি আমতা আমতা করতে থাকলেন, জবাব না দিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। তারপর একসময় আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়েই ফোন রেখে দিলেন!
এইবার আমি অবাক হইনি! মানুষ্য চরিত্র নিয়ে আসলেও অবাক হবার কিছুই নেই।

রেনু লুৎফা: লেখক ও শিক্ষাবিদ

 

You might also like